সুবিধাবাদের মূর্ত প্রতীক
চট্টগ্রাম অফিস
প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৫ ২২:৪৮ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ছিল সখ্য। তাদের হাত ধরেই হয়েছিলেন চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক। সেই ব্যবসায়ী এখন ভোল পাল্টে হয়েছেন বিএনপিপন্থী। আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পটপরিবর্তনের পর ভোল পাল্টে নিজেকে ‘হাসিনা আমলে ক্ষতিগ্রস্ত’ এবং ‘বঞ্চিত ও ভুক্তভোগী’ বলেও প্রচার করছেন।
একসময়ের আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ‘সীকম গ্রুপ’র চেয়ারম্যান আমিরুল হক এবার নিজেকে বিএনপির রাজনীতির ঘনিষ্ঠজন হিসেবে প্রচার করছেন। গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকেই সখ্য গড়ে তুলছেন বিএনপি নেতাদের সঙ্গে। তাদের সহায়তা নিয়েই হয়েছেন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলওএবি) সভাপতি। এখন প্রেসিডেন্ট হতে চাইছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের বৃহৎ সংগঠন চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির।
জানা যায়, আমিরুল হক ব্যবসায় নাম লেখান শিপ ব্রেকিংয়ের মাধ্যমে, এরপর একে একে গড়ে তোলেন নানা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগ নেতা এমএ লতিফ এবং দরবেশ বলে পরিচিত বেক্সিমকো গ্রুপের চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের সখ্য কাজে লাগিয়ে তিনি আর্থিক খাতের অবাধ লুণ্ঠনের মাধ্যমে ফুলেফেঁপে ওঠেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, গত বছর শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরই ভোল পাল্টান আমিরুল হক। তিনি বিএনপির নীতিনির্ধারক এক ব্যবসায়ী নেতার আশীর্বাদে বাগিয়ে নেন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলওএবি) সভাপতি পদ। অভিযোগ উঠেছে, সভাপতি হওয়ার পরপরই তার যোগসাজশে অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয় এলপিজি সিলিন্ডারের দাম। এ ছাড়া বন্দরের ট্যারিফ বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা তৈরির অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। ব্যবসায়ীরা জানান, একসময় আমিরুল হক নিজেই বন্দরকে প্রাইভেট সেক্টরে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলতেন। আর এখন সরকার যখন বন্দরকে বেসরকারি খাতে দেওয়ার জন্য বিদেশি অপারেটর নিয়োগ দিতে চাইছে তখন তিনি এর বিরোধিতা করছেন। বন্দরের ট্যারিফ বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে আমিরুল হক ক্রমাগত উস্কানি দিয়ে চলেছেন বলেও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এবার চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা চেম্বার নির্বাচনে দুটি প্যানেলে বিভক্ত হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ দুটি প্যানেলের মধ্যে আমিরুল হক নেতৃত্বে আছেন ইউনাইটেড বিজনেস ফোরামের ব্যানারে সংগঠিত প্যানেলের। এ প্যানেল নিয়ে ক্ষোভ দানা বেঁধেছে খোদ বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ীদের মধ্যেও। একসময় শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত আমিরুল হকের নির্বাচনে অংশগ্রহণ মেনে নিতে পারছেন না তারা। তাদের দাবি, ফ্যাসিবাদী শাসনের গত ১৫ বছর শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে আমিরুল হক একের পর এক ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও তিনি ব্যবসা করছেন আগের মতোই। অথচ ২০২৪ সালের ২২ জুলাই, যখন সরকারবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে, রিকশাচালক থেকে শুরু করে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ যখন যোগ দিচ্ছে ছাত্রদের সঙ্গে, সে সময় আমিরুল ইসলাম যোগ দিয়েছিলেন আওয়ামীপন্থী ব্যবসায়ীদের ডাকা সম্মেলনে। যে সম্মেলনে শেখ হাসিনা ছিলেন প্রধান অতিথি।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে সীকম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আমিরুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘একটি পক্ষ আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে আমাকে প্রতিহত করার চেষ্টা করছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে কখনও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না।’
গত বছরের ৫ আগস্টের পর অনেক ব্যবসায়ী দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি রাজনীতির সঙ্গে কখনও ছিলাম না বিধায় দেশে আছি। ব্যবসা করছি। আমার লক্ষ্য ব্যবসায়ীদের সমষ্টিগত স্বার্থ রক্ষা করা। সেজন্যই চেম্বারের নির্বাচন করছি। চেম্বার কোনো রাজনৈতিক সংগঠন নয়, এটি ব্যবসায়ীদের প্লাটফর্ম।’
তিনি আরও বলেন, ‘যেসব বলা হচ্ছে তার সবই ভিত্তিহীন। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাকে হেয়প্রতিপন্ন করতে এসব কথা ছড়ানো হচ্ছে। বন্দরের ট্যারিফ নিয়ে কথা বলছি, কারণ ট্যারিফ বৃদ্ধি সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এতে আমদানি-রপ্তানি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। বন্দর সেবামূলক প্রতিষ্ঠান, তারা কখনও লোকসানও দিচ্ছে না। লাভে থাকার পরও একসঙ্গে ৪১ শতাংশ ট্যারিফ বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নেই। এজন্যই আমরা ট্যারিফ বৃদ্ধি নিয়ে কথা বলছি।’
এদিকে বিএনপিপন্থী একাধিক ব্যবসায়ীর অভিযোগ, যারা শেখ হাসিনার থেকে অবৈধ সুবিধা নিয়ে অর্থবিত্তে, ব্যবসা-বাণিজ্যে গত দেড় দশকে ফুলেফেঁপে উঠেছেন, তারাই ঘুরেফিরে চেষ্টা করছেন ব্যবসায় সংগঠনের নেতৃত্বে আসার। আওয়ামীপন্থী এসব ব্যবসায়ী যদি নেতৃত্বে আসেন তাহলে যারা স্বৈরাচারী শাসনামলে মামলা-হামলা এবং কারাভোগের কারণে কোনো ব্যবসাই করতে পারেননি, তাদের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে।
প্রসঙ্গত, আমিরুল হকের মালিকাধীন প্রতিষ্ঠান সীকম গ্রুপ ১২টি খাতে ব্যবসা পরিচালনা করছে। তার গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ সীকম শিপিং লাইনস, সীকম হোল্ডিংস লিমিটেড, অ্যানশিয়েন্ট প্রোপার্টিজ লিমিটেড, প্রিমিয়ার সিমেন্ট, ন্যাশনাল সিমেন্ট মিলস লিমিটেড, ডেল্টা এলপিজি লিমিটেড, ডেল্টা শিপইয়ার্ড লিমিটেড, ডেল্টা অ্যাগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ লি., রোকনূর মেরিটাইম লিমিটেড, ট্রান্সচার্ট নেভিগেশন লিমিটেড, বেঙ্গল স্যাক করপোরেশন লিমিটেড, রোকনূর নেভিগেশন লিমিটেড, রূপসা ট্যাঙ্ক টার্মিনাল অ্যান্ড রিফাইনারিজ লিমিটেড, আরিয়ান স্টিভ ডোরস লিমিটেড, প্রিমিয়ার পাওয়ার জেনারেশন লিমিটেড, চিটাগাং ব্যাগস লিমিটেড, রোকনূর অ্যাগ্রিফার্ম লিমিটেড, রূপসা এডিবল অয়েল অ্যান্ড রিফাইনারি এবং সিটি হল কনভেনশন সেন্টার।