মাশরুর মুর্শেদ, খুলনা
প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:৩৯ পিএম
ছবি: প্রবা
গ্রামীণ জীবনের অপরিহার্য অংশ ছিল বাঁশ ও বাঁশের তৈরি সামগ্রী। একসময় গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে দেখা যেত কুলা, চালনি, ঝুড়ি, খাঁচা, চাটাই, পলো কিংবা ডোলা যেগুলো ছাড়া চলত না দৈনন্দিন জীবন। কিন্তু প্লাস্টিকের আগ্রাসন ও যান্ত্রিকতার যুগে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে সেই ঐতিহ্যবাহী বাঁশ শিল্প। খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার মধুগ্রাম, সাজিয়াড়া, গোলনা, চেঁচুড়ি ও মিকশিমিলসহ বিভিন্ন গ্রামে একসময় যে শিল্পে ছিল কর্মচাঞ্চল্য, আজ তা টিকে থাকার সংগ্রামে হিমশিম খাচ্ছে অল্প কয়েকটি পরিবার। পৈতৃক পেশা ধরে রাখতে না পেরে একে একে পেশা বদলাচ্ছেন দাস বা ঋষী সম্প্রদায়ের কারিগররা। ফলে বিলুপ্তির পথে গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক অমূল্য অধ্যায়।
মধুগ্রামের বাঁশ
শিল্পী রবীন্দ্রনাথ দাস (৪৮) বলেন, বাপ-দাদারা এই কাজ করতেন, আমিও করছি, আগে বাঁশের
সামগ্রী বিক্রি করে সংসার চললেও এখন লোকসান ছাড়া কিছু নেই। যে বাঁশ আগে ১০০ টাকায় পাওয়া
যেত, এখন তা কিনতে হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। বাঁশের দাম বাড়লেও পণ্যের দাম বাড়েনি।
একসময় গ্রামের বাজারে বাঁশের পণ্য বিক্রির ধুম থাকলেও এখন সেই বাজারে জায়গা দখল করেছে
রঙিন প্লাস্টিকের পাত্র ও ঝুড়ি। এ পেশায় এখন টিকে থাকাই কঠিন।
গোপাল দাস (৬৫)
ও শুকুমার দাস (৪৩) জানান, আমাদের ছেলেমেয়েরা বলে এই কাজ করলে পেট ভরে না। তাই কেউ
ভ্যান চালায়, কেউ সেলুনে কাজ করে।
তরুণ সুদেব দাস
(৩৮) বলেন, উচ্চ শিক্ষা শেষ করেও চাকরি হয়নি, তাই এই পেশাতেই আছি। ঝুড়ি, ডোলা বানিয়ে
মা-বোন নিয়ে কোনোমতে বাঁচছি। কেউ আর এই কাজকে মূল্যায়ন করে না, ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছে
এই শিল্প।
ডুমুরিয়া উপজেলার
মধুগ্রামের ৩৪টি পরিবারের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৯টি পরিবার এখনও বাঁশ শিল্পের সঙ্গে
যুক্ত। বাকি পরিবারগুলো জীবিকার প্রয়োজনে অন্য পেশায় চলে গেছে। আগে এই গ্রামগুলোতে
বিয়ের মৌসুম, পূজা-পার্বণ বা মেলায় বাঁশের পণ্য বিক্রি হতো ব্যাপকভাবে। এখন সেসবের
স্থান নিয়েছে প্লাস্টিক সামগ্রী, যা সস্তা হলেও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
শিল্পী হরবিলাস
দাস (৫০) বলেন, আমরা সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে বাঁশ কিনি। বাজারে বিক্রি করতে গেলে লোকসান
হয়। বাঁশের কাজ করতে করতে বয়স গেছে, এখন আর কিছু করতে পারি না। তারপরও ঐতিহ্যটা ধরে
রাখার চেষ্টা করি।
বৃদ্ধ খগেন দাস
(৭০) বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই এ পেশায় রয়েছি। একসময় বাঁশের জিনিস ছাড়া সংসার না চললেও
এখন এগুলো অনেকে চিনেও না।
স্থানীয় কবি ও সাহিত্যিক
শেখ আজিজুর রহমান বলেন, বাঁশ ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড। ঘরবাড়ি নির্মাণ থেকে
শুরু করে মাছ ধরার ফাঁদ, খাঁচা, চালনি, চাটাই সবকিছুই বাঁশ ছাড়া সম্ভব ছিল না। আজ সেই
বাঁশের ব্যবহার কমে যাওয়ায় গ্রামের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোতেও পরিবর্তন এসেছে।
একদিকে বাঁশের দাম বেড়েছে, অন্যদিকে বাঁশের চাষ কমে গেছে। আগে প্রতি বাড়িতে ছোট একটি
বাঁশবাগান থাকত। এখন সেসব জায়গা দখল করছে বাড়িঘর ও দোকানপাট।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সুব্রত বিশ্বাস বলেন, আমরা সাধারণত এদের অনগ্রসর গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করি। এই সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নে সরকার ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। দাস সম্প্রদায়ের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারিভাবেও এগিয়ে আসতে হবে।