প্যাসিফিক গ্রুপ
আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:৩৭ এএম
ছবি : সংগৃহীত
চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (সিইপিজেড) এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভ ও অস্থিরতার জেরে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষিত প্যাসিফিক গ্রুপের আটটি পোশাক কারখানা পুনরায় খুলে দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) থেকে এসব কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
গত মঙ্গলবার রাতে গ্রুপটির এক নোটিসে জানানো হয়, সাম্প্রতিক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণে ১৬ অক্টোবর থেকে কারখানার কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। বর্তমানে সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় এবং অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ায় কারখানাগুলো পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কারখানাগুলো হলোÑ প্যাসিফিক জিন্স-১, প্যাসিফিক জিন্স-২, প্যাসিফিক অ্যাটায়ারস, প্যাসিফিক অ্যাক্সেসরিজ, প্যাসিফিক ওয়ারকওয়্যারস, ইউনিভার্সেল জিন্স, এইচটি ফ্যাশন ও জিন্স ২০০০। এসব কারখানায় প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক কাজ করে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শ্রমিকদের একটি আন্দোলন ঘিরে শিল্প পুলিশের করা একটি মামলাকে কেন্দ্র করে কারখানাগুলোতে আন্দোলন দানা বাঁধে। পুলিশ বলছে, মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া ঘিরে পরকল্পিত উস্কানি দিয়ে শ্রমিক অসন্তোষের চেষ্টা করা হয়েছিল।
তবে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মালিকপক্ষের প্রতি আস্থা থাকলেও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ওপর দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে শ্রমিকদের। সেই ক্ষোভ পরিস্থিতি বুঝে উস্কে দেওয়ার সুযোগও সাম্প্রতিক সময়ে বারবার সৃষ্টি হচ্ছে।
নজিরবিহীন ওভার ডিউটি করানো, শ্রমিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, অসুস্থতার মধ্যেও ছুটিছাটা না পাওয়াসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রতি শ্রমিকদের অসন্তোষ আছে বলে জানা গেছে।
প্যাসিফিক জিন্সের স্টোরের এক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘পণ্য জাহাজীকরণের সময় এমনও ঘটনা ঘটেÑ একদিন সকাল ৮টায় ডিউটিতে ঢুকে পরদিন ভোর ৫টায় বের হতে হয়। তিন ঘণ্টা বাদে আবার নতুন দিনের ডিউটিতে যোগ দিতে হয়। মাঝের যে তিন ঘণ্টা সময় এই সময় ফ্যাক্টরিতে থাকা যাবে না, বের হয়ে যেতে হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটা আমার কাছে অমানবিক মনে হয়।’
তিনি বলেন, ‘টানা ২১ ঘণ্টা ডিউটি করার ক্লান্তি নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে তিন ঘণ্টা পর আবার কাজে যোগ দিতে হবে। আবার এই তিন ঘণ্টার জন্য আপনাকে কারখানা থেকে বের করে দেবে। শ্রমিকদের সবার বাসা তো আশপাশে হয় না। অনেকের বাসায় আসা-যাওয়াতেই তিন ঘণ্টা লাগে। এসব নিয়ে কথা বলারও সুযোগ কম। এমনিতে এই কোম্পানির সুনাম আছে। কিন্তু ম্যানেজমেন্টের লোকজন প্রচণ্ড দুর্ব্যবহার করে।’
‘এসব কারণে শ্রমিকদের মধ্যে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ আছে, যদিও তা মালিকদের বিরুদ্ধে নয়’, যোগ করেন তিনি।
অসুস্থতার মধ্যেও চাকরি থেকে ছাঁটাইয়ের হুমকি শুনতে হয়Ñ এমন অভিযোগ জানিয়ে আরেক শ্রমিক বলেন, ‘কয়েক দিন আগে আমার জ্বর হয়েছিল। প্রচণ্ড গায়ে ব্যথা। তখন চিকুনগুনিয়ার একটা আতঙ্ক ছিল। আমি ডাক্তার দেখিয়ে টেস্ট করলাম। অফিসে এটা জানালাম। কিন্তু কাজে যোগ দেওয়ার পর আমাকে বলা হলো এভাবে হুটহাট ছুটি কাটালে চাকরি থাকবে না। কাজ করার ইচ্ছা না থাকলে আমি যেন চাকরি ছেড়ে দেই। কথার কথায় এই হুমকি দেওয়া হয়। এটাও একটা কারণ শ্রমিকদের ক্ষেপে থাকার।’
এসব অভিযোগ সত্য বলে জানালেও স্যাম্পল সেকশনে কর্মরত হুমায়ুন নামে আরেক শ্রমিকের বক্তব্য খানিকটা ভিন্ন। তিনি বলেন, ‘ইমার্জেন্সি শিপমেন্টের ক্ষেত্রে মাঝেসাঝে অতিরিক্ত সময় কাজ করানোর ঘটনা ঘটে। এটা মাসে-দুই মাসে একবার। মালিকের কথাও ভাবতে হবে শ্রমিকদের। আর ছুটিছাটা নিয়ে সব ডিপার্টমেন্টেই সমস্যা হয়। যেমন, আমার সেকশনে এটা নিয়ে সমস্যা হয়। প্রোডাকশনে হয়। এখন একজন মেশিন অপারেটর না থাকলে মেশিনটা অচল থাকবেÑ এটাও একটা ব্যাপার। এগুলো মূল সমস্যা না। সমস্যা হচ্ছে ম্যানেজমেন্টে যারা আছে তারা ভয় দেখিয়ে, গালি দিয়ে এটাকে চাপিয়ে দিতে চায়। বুঝিয়ে বললে এমন হয় না।’
সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের যে মামলাকে ঘিরে শ্রমিকরা আন্দোলনে যায়, সেখানেও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দায় ছিল জানিয়ে এই শ্রমিক বলেন, ‘বিষয়টা নিয়ে আমরা যখন কর্তৃপক্ষের কাছে গেলাম তারা আমাদের কোনো সমাধান দিল না। উল্টো বলল, তোমরা আন্দোলন করছ, তোমরা সামাল দাও। একজন ম্যানেজার তো বললেন, মামলা ও কাজ দুটোই চলবে। এসব কারণেই ক্ষোভ তীব্র হয়।’
এর মধ্যেই পরিকল্পিত উস্কানি দেওয়ার ঘটনা ঘটে। গত ১৬ অক্টোবর সকালে তিন শ্রমিকের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে সংঘাতের চেষ্টাও চালানো হয়। এর প্রেক্ষিতে সেদিনই আটটি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। কারখানা চালুর এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছে শ্রমিকরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশের সুপার আবদুল্লাহ আল মাহমুদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘দফায় দফায় শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু এই অভিযোগগুলো শুনিনি আমি। এসব অভিযোগ তো ভয়াবহ। এ ক্ষেত্রে বেপজায় এসব অভিযোগ দেওয়ার সুযোগ আছে। তাদেরও সম্ভবত এ বিষয়ে কেউ অভিযোগ করেনি।’
পরিকল্পিত শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে জড়িতদের শনাক্ত করা ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘বন্ধ কারখানা চালু করাতে বেশি জোর দিয়েছি আমরা। অন্য বিষয়গুলো আমরা ধারাবাহিকভাবে দেখছি। তবে জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে। এ মুহূর্তে এর বেশি কিছু বলতে চাই না।’