হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:০৯ পিএম
প্রতীকী ছবি
২৫ মার্চ সন্ধ্যা ৭টা, বেপজার কাস্টমস ইন আউট গেট বন্ধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন থিয়ানিস অ্যাপারেলস লিমিটেডের শ্রমিকরা। আগের মাসের (ফেব্রুয়ারি) বেতন এবং ঈদ বোনাসের দাবিতে বিক্ষোভ করেন তারা। ওইদিন ফিরে গেলেও পরের মাসের ২৯ এপ্রিল আবারও সেখানে আন্দোলন করেন শ্রমিকরা। এরপর ৮ মে আবারও আন্দোলনে নামেন থিয়ানিস অ্যাপারেলস লিমিটেডের শ্রমিকরা। বকেয়া বেতনের দাবিতে ওইদিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কারখানা এলাকায় বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন তারা।
পরপর তিন মাস বেতন দিতে না পারায় শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে গত ১ জুলাই কারখানাটি বন্ধ করে দেয় মালিকপক্ষ। মালিকপক্ষের দাবি, একদিকে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, অন্যদিকে কাজের অর্ডার না থাকায় আর্থিক সংকটে কারখানাটি বন্ধ করে দিতে হয় বাধ্য হয়েছেন তারা। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েন ওই কারখানার ৬৬৮ জন শ্রমিক।
শুধু থিয়ানিস অ্যাপারেলস লিমিটেড নন, শ্রমিক অসন্তোষ, অগ্নিকাণ্ড, কাজের অর্ডার না থাকাসহ নানা কারণে আর্থিক ক্ষতি এড়াতে গত এক বছরে চট্টগ্রামে স্থায়ী এবং অস্থায়ীভাবে ১১৭টি কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে মালিকপক্ষ। এসব কারখানা বন্ধের কারণে গত এক বছরে কর্মহীন হয়েছেন অন্তত ৫১ হাজার শ্রমিক।
শ্রমিক অসন্তোষের মুখে সর্বশেষ ১৬ অক্টোবর আটটি কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে প্যাসিফিক গ্রুপ। কারখানাগুলো হলো- প্যাসিফিক জিন্স-১, প্যাসিফিক জিন্স-২, প্যাসিফিক অ্যাটায়ারস, প্যাসিফিক অ্যাকসেসরিজ, প্যাসিফিক ওয়ার্কওয়্যারস, ইউনিভার্সেল জিন্স, এইচটি ফ্যাশন ও জিন্স ২০০০। একসঙ্গে এই আটটি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করায় কর্মহীন হয়ে পড়েন প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক। একই সময়ে অগ্নিকাণ্ডে পুরো কারখানা জ্বলে যাওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েন অ্যাডামস ক্যাপ অ্যান্ড টেক্সটাইল লিমিটেডের প্রায় ৩ হাজার শ্রমিক।
বিজিএমইএ প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘কারখানা একদিকে বন্ধ হবে অন্যদিকে আবার নতুন করে খুলবে, এটি কোনো সমস্যা না। কিন্তু এখন আমাদের দেশে কস্ট অব ডুয়িং এবং ইজ অব ডুয়িং বিজনেস অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। তাই পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না, লোকসান এড়াতেই কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে দিচ্ছে। তাই তৈরি পোশাক খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে কস্ট অব ডুয়িং বিজনেসে জোর দিতে হবে। অন্যথায় আমরা অনেক পিছিয়ে পড়ব।’
তিনি আরও বলেন, ‘কস্ট অব ডুয়িং এবং ইজ অব ডুয়িং বিজনেস হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে এখন স্বল্পমেয়াদি কিছু চ্যালেঞ্জ যুক্ত হয়েছে। শ্রমিক অসন্তোষ, কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ড, রাজনৈতিক পরিস্থিতি কারখানা বন্ধের ক্ষেত্রে এসব বিষয়ও ভূমিকা রাখছে। তবে আপনি দেখবেন আমাদের রপ্তানি ভলিউম খুব একটা কমেনি। এসব কারখানা যদি বন্ধ না হতো তাহলে আমাদের রপ্তানি ভলিউম আরও কয়েকগুণ বেড়ে যেত।’ কারখানা যাতে বন্ধ না হয়, সেজন্য সরকারকে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জগুলো সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার অনুরোধ জানান এই পোশাক রপ্তানিকারক।
চট্টগ্রামের আওতাধীন আরএমজি এবং নন-আরএমজি মিলে মোট ১ হাজার ৭২০টি কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় ৬ লাখ ১৩ হাজার ২৯০ জন শ্রমিক কাজ করেন। এর মধ্যে আরএমজি কারখানা রয়েছে ৫৭০টি। এই তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে কাজ করেন ৩ লাখ ৯৮ ৫৮২ জন শ্রমিক।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-৩-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের আগস্ট থেকে এই পর্যন্ত চট্টগ্রামে স্থায়ী এবং অস্থায়ী মিলে মোট ১১৭টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এসব কারখানায় ৫১ হাজার ৬৭০ জন শ্রমিক কাজ করতেন। এর মধ্যে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে ৫০টি কারখানা, যেখানে ৮ হাজার ৭৪৩ জন শ্রমিক কাজ করতেন। বাকি ৬৭টি কারখানা অস্থায়ী হিসেবে বন্ধ রয়েছে। এসব কারখানায় ৪২ হাজার ৯২৭ জন শ্রমিক কাজ করতেন।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-৩-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের আগস্ট থেকে এই পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৭০টি কারখানায় ৩৫০টি শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটেছে। এরই মধ্যে বেশিরভাগ ঘটনা ঘটেছে বকেয়া বেতন-ভাতা আদায়ের দাবিতে। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা না দিয়ে কারখানা বন্ধ বা লে অফ ঘোষণার কারণেই অধিকাংশ কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ হয়েছে।
কাজের অভাব এবং ব্যাংকিং জটিলতার কারণে গত ৪ মার্চ জেএমএস গ্রুপের মালিকানাধীন জেএমএস গার্মেন্টস কারখানা লে-অফ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ ইপিজেড শ্রম আইন, ২০১৯-এর ১৫ ধারা অনুযায়ী ২০ ও ২৩ মার্চ শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন ও ঈদ বোনাস পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কেউ তাদের পাওনা বুঝে পাননি। এ ঘটনায় চলতি বছরের গত ২২ মার্চ বকেয়া বেতনের দাবিতে ইপিজেডের সামনের সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন শ্রমিকরা। ওইদিন শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে দুই দিন পর বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ করার ঘোষণা দেয় মালিকপক্ষ। কিন্তু ওই সময়ে বকেয়া বেতন না দেওয়ায় ২৪ মার্চ আবারও সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেছেন জেএমএস গার্মেন্টস লিমিটেডের শ্রমিকরা।
এরপর ৯ এপ্রিল সকালে নগরীর ইপিজেড মোড় এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন মডেস্টি কারখানার শ্রমিকরা। ঈদ বোনাসের দাবিতে ওইদিন সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন জেএনএফ করপোরেশনের অধীন এই প্রতিষ্ঠানটির শ্রমিকরা।
২৪ সেপ্টেম্বর ইপিজেড এলাকায় বিক্ষোভ করেন নাসা গ্রুপের দুটি কারখানার শ্রমিকরা। বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ না করে অক্টোবর মাস থেকে কারখানা দুটি বন্ধ ঘোষণা করে দেওয়ায় ওইদিন সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন তারা। এরপর গত ১১ অক্টোবর সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি ইউনিয়নে বকেয়া বেতনের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন মারস টেক্সটাইল মিল নামের সুতা তৈরির কারখানার শ্রমিকরা। বেতন বাকি রেখেই কারখানাটি বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে, এ আশঙ্কায় রাস্তায় নেমে আসেন তারা।
শিল্প পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে যেসব কারখানায় যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল, দুয়েকটি কারখানা ছাড়া বাকি সব কারখানায় বকেয়া বেতন-ভাতা নিয়েই বিক্ষোভ করেছেন শ্রমিক।’ কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি মালিকরা লোকসান এড়াতেই এখন বেশিরভাগ কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছেন।