মির্জাগঞ্জ (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৫ ১৫:৩৮ পিএম
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের আমড়াগাছিয়া ইউনিয়নের ডোমরাবাদ এলাকায় ধানবোঝাই ট্রলারের ধাক্কায় ’ডোমরাবাদ-জলিশা সংযোগ ব্রিজটি ভেঙে পড়ায় গত ৫ বছর দুই উপজেলার মানুষ ভোগান্তিতে । দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় গত ৫ বছর যাবত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ডিঙি নৌকায় পারাপার হতেন স্কুল শিক্ষার্থী ও কৃষকসহ স্থানীয় বাসিন্দারা। সম্প্রতি নদের তীরবর্তী দুইপাশের স্থানীয় বাসিন্দাদের নিজস্ব অর্থায়নে ভাঙা সেতুর পশ্চিমাংশে গাছ দিয়ে অস্থায়ী সাঁকো বানিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলছে মির্জাগঞ্জ উপজেলার ডোমরাবাদ ও পার্শ্ববর্তী বেতাগী উপজেলার মানুষের যোগাযোগ। ভেঙে পড়ার পর পরই উপজেলা এলজিইডি বিভাগ ভাঙা লোহার এ্যাংগেলগুলো নিজেদের হেফাজতে নিলেও ব্রিজের বড় একটি ভাঙা অংশ অপসারণ না করায় এখনও পর্যন্ত ব্রিজের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এতে নদে চলাচলরত মালবাহী ট্রলার নিরাপত্তাহীরতায় চরম ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে; নদ পারাপারে দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে স্থানীয় কৃষক, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সাধারণ মানুষকে। তবে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় পথচারীদের ৪-৫ কিলোমিটার পথ বেশি হাঁটতে হচ্ছে। এদিকে ঝুঁকি ও দুর্ঘটনার আশঙ্কায় দিন দিন কমে যাচ্ছে স্থানীয় ডোমরাবাদ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা।
জানা যায়, ২০০৬ সালে ৭ এপ্রিল সেতুটি নির্মিত হয়। সেতুটির পশ্চিম পাড়ে পার্শ্ববর্তী বরগুনার ও বেতাগী উপজেলার জলিশা এবং পূর্বপাড়ে পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার ডোমরাবাদ গ্রাম। সেতুটি দিয়ে উপজেলার ডোমরাবাদ, উত্তর আমড়াগাছিয়া, মধ্য আমড়াগাছিয়া এবং ওপারের হোসনাবাদ, জলিশা এলাকার কয়েক হাজার মানুষ প্রতিনিয়ত যাতায়াত করতেন। কিন্তু ব্রিজটি নির্মাণের ১৪ বছর পরে ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে একটি ধান বোঝাই ট্রলারে ধাক্কায় ভেঙে পড়ে ব্রিজটি। এতে যাতায়াতে ভোগান্তিতে পড়ে দুই উপজেলার মানুষ।
মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) ডোমরাবাদ এলাকায় সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বেড়েরধন নদের ব্রিজের পশ্চিম পাশের ভাঙা একাংশ পূর্ব পাশের অবকাঠামোর সঙ্গে ঝুলে রয়েছে। সেতুটি ভাঙার পরে কোনো সংস্কার না হওয়ায় দীর্ঘ প্রায় ৫ বছর স্কুলের কোমলমতি শিক্ষার্থীসহ বাসিন্দারা জনপ্রতি ৫ টাকার বিনিময়ে প্রতিবার পারাপার হতেন। সম্প্রতি স্থানীয়রা চাঁদা তুলে সেতুর পশ্চিমাংশের ভাঙা অংশে গাছ দিয়ে সাঁকো তৈরি করে চলাচল করছেন। বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দুই পাশে নেট (মাছের ঘেরে ব্যবহৃত সবুজ রংয়ের বিশেষ কাপড়) লাগিয়ে বিশেষ নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে। এতে সন্তোষ প্রকাশ করেন নদ তীরবর্তী দুই গ্রামের স্কুল শিক্ষার্থী,অভিভাবক, কৃষকসহ সহস্রাধিক মানুষ।
স্থানীয়রা বলেন, নদের উপর ব্রিজ না থাকায় দুই উপজেলার যোগাযোগ, কৃষি আবাদ, হাটবাজার ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। গ্রামগুলোতে বসবাসরত কোনো রোগীকেও জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নিতে প্রায় ১০-১২ কি.মি. পথ ঘুরিয়ে নিতে হচ্ছে। অথচ এখানে ব্রিজ থাকলে অনেক সহজে এবং তাড়াতাড়ি নিয়ে যাওয়া যেত। এছাড়াও যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে কৃষকরাও তাদের আবাদকৃত ফসল ঠিকমত বাজারজাত করতে না পারায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। গত ৫ বছরের অধিক সময় ধরে স্কুলের শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা ডিঙি নৌকায় জনপ্রতি ৫ টাকা ভাড়া দিয়ে নদ পার হতেন। সম্প্রতি দুই পারের বাসিন্দারা চাঁদা তুলে গাছ দিয়ে সাঁকো তৈরি করে নেট দিয়ে আবৃত করা হয়েছে। এতে কষ্ট কিছুটা লাঘব হলেও কোনো সন্তান সম্ভাবা প্রসূতি মা’সহ যেকোনো রোগীকে হাসপাতালে নিতে হলে ১০-১২ কি. মি. পথ ঘুরিয়ে হাসপাতালে নিতে হয়। এছাড়াও ঝুঁকিপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে স্থানীয় কৃষকরা তাদের আবাদকৃত ফসল সঠিক সময়ে বাজারজাত করতে পারছেন না, ফলে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা।
হোসনাবাদ গ্রামের বাসিন্দা মো. ইউসুফ মিয়া বলেন, আমার এক মেয়ে ও দুই ভাতিজা ডোমরাবাদ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত, ব্রিজ ভাঙার পরে কিছুদিন নৌকায় যাতায়াত করে ক্লাশে যেত। এখন সাঁকো দিয়ে পার হতে বাচ্চাদের ভয় লাগায় ওদের বেতাগী উপজেলার জলিসা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করেছি।
ডোমরাবাদ গ্রামের বাসিন্দা আনিসুর রহমান ও আলী আকবর বলেন, এই সেতুটি ৫ বছর আগে ভেঙে পড়ে, স্থানীয় চেয়ারম্যান-মেম্বাররা এটা সংস্কারে কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় স্থানীয় মানুষা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে, মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই, নির্বাচন এলেই তারা ভোটের জন্য পাগল হয়ে যায়। স্কুলশিক্ষার্থী ও কৃষকসহ বাসিন্দাদের দুর্ভোগ লাঘবে অতি দ্রুত এখানে একটি ব্রিজ নির্মাণ করার দাবি জানাই। এতে শিক্ষার্থীরা সুশিক্ষিয়া শিক্ষিত হওয়াসহ স্থানীয় কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।
ডোমরাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মার্জিয়া আক্তার, সুমাইয়া ও সুজন বলেন, ব্রিজ ভাঙার পর প্রতিদিন ১০ টাকা নৌকা ভাড়া দিয়ে পার হয়ে স্কুলে যাওয়া-আসা করতাম। আমাদের কয়েক সহপাঠী এই স্কুল ছেড়ে অন্য স্কুলে ভর্তি হয়েছে। এখন সাঁকো পার হয়ে স্কুলে যেতে অনেক ভয় লাগে।
ব্রিজসংলগ্ন ডোমরাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ফিরোজ আলম বলেন, ব্রিজটি ভেঙে যাওয়ায় মির্জাগঞ্জ উপজেলা ও পার্শ্ববর্তী বেতাগী উপজেলার মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পশ্চিম পাড়ের হোসানবাদ গ্রামের প্রায় ২৫-৩০ জন শিক্ষার্থী স্কুলে আসতে পারে না। প্রথম দিকে শিক্ষার্থীরা খেয়া পার হয়ে এলেও সাঁকো পারাপার ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় তাদের মধ্যে অনেকেই এখন আসতে পারছে না। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যাও দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।
এ ব্যাপারে মির্জাগঞ্জ উপজেলার প্রকৌশলী (এলজিইডি) চন্দন কুমার চক্রবর্তী জানান, ডোমরাবাদ এলাকায় ভেঙে যাওয়া ব্রিজের স্থানের সয়েল টেস্ট সম্পন্ন করে বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। বরাদ্দ পেলেই দরপত্র আহ্বান প্রক্রিয়া শেষ করে অতি শিগগিরই ব্রিজ নির্মাণের কাজ শুরু করা হবে।