বিদ্যুৎ খাত
হাসান লিটন, চরফ্যাশন (ভোলা)
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৫ ১১:২৬ এএম
ভোলার চরফ্যাশনের এওয়াজপুর ইউনিয়নে নির্মাণাধীন হাইভোল্টেজ উপকেন্দ্র। সোমবার তোলা। প্রবা ফটো
ভোলার চরফ্যাশনে দেশের অন্যতম আধুনিক ২৩০/৩৩ কেভি ক্ষমতাসম্পন্ন হাই ভোল্টেজ জিআইএস সাবস্টেশন গ্রিড (বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র) তৈরি হচ্ছে। এটি চালু হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। লো-ভোল্টেজের লেশমাত্র থাকবে না। সিস্টেম লসও আশাতীতভাবে কমবে। সেই সঙ্গে চরফ্যাশনে প্রত্যাশিত শিল্প কারখানা গড়ে উঠবে। এলাকার মানুষের ভাগ্যের চাকা ঘুরে যাবে। কর্মসংস্থানের পথও তৈরি হবে। ইলিশের দ্বীপাঞ্চল চরফ্যাশনে অর্থনৈতিক উন্নয়নে খুলবে নতুন দুয়ার।
গ্রিড সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ সরকার ও এডিবির যৌথ অর্থায়নে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান রিভারি পাওয়ার অ্যান্ড অটোমেশন ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড এবং চীনা প্রতিষ্ঠান এসপিটিডিই। এ ছাড়া জলবায়ু তহবিল থেকেও বিনিয়োগ করা হয়েছে।
২০২৩ সালের মে মাসে পিজিসিবির প্রধান কার্যালয়ে উভয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই করার পর কাজ শুরু হয়। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে উপকেন্দ্রটি চালুর লক্ষ্যে দিনরাত দ্রুত গতিতে কাজ চলছে।
সূত্র আরও জানায়, গ্রিডটি চালু হলে ভোলার শাহবাজপুর গ্যাসকেন্দ্র থেকে প্রতিদিন উৎপাদিত প্রায় ৪২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ফাইবার ক্যাবলের মাধ্যমে এই গ্রিডে পৌঁছাবে। ওই ক্যাবল ব্যবহার করে দ্রুতগতির ইন্টারনেটও সরবরাহ করা যাবে, যা মোবাইল টাওয়ারের বিকল্প হিসেবেও কাজ করবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির ঝুঁকি কমাতে আধুনিক প্রযুক্তির বজ্রপাত নিরোধক এবং সুরক্ষিত সঞ্চালন ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে।
গতকাল সোমবার দুপুরে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, চরফ্যাশন উপজেলার এওয়াজপুর ইউনিয়নের প্রধান সড়কের পাশে প্রায় পাঁচ একর জমিতে নির্মাণ করা হচ্ছে এই হাই ভোল্টেজ উপকেন্দ্রটি। এখানে বানানো হচ্ছে আধুনিক কন্ট্রোল বিল্ডিং, স্টাফ ভবন ও আনসার ব্যারাকসহ তিনটি স্থাপনা। পাশাপাশি ৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ সঞ্চালন লাইনের জন্য ১২৫টি সু-উচ্চ বৈদ্যুতিক টাওয়ার স্থাপন করা হচ্ছে। এগুলোর প্রতিটির উচ্চতা প্রায় ৬৫ মিটার।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, বিদ্যুৎ সঞ্চালন সীমাবদ্ধতার কারণে চরফ্যাশনে দীর্ঘদিন ধরে লোডশেডিং ও লো-ভোল্টেজ সমস্যা চলছিল। নতুন উপকেন্দ্র চালু হলে এ সমস্যা দূর হবে এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হবে।
সামরাজ মৎস্য ঘাটের সভাপতি তারেক আজিজ বলেন, সামরাজ মৎস্য ঘাট দেশের অন্যতম ইলিশ আহরণকেন্দ্র। নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ পাওয়া গেলে এখানে গড়ে উঠবে মৎস্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প ও হিমাগার। এতে ইলিশ সংরক্ষণ ও রপ্তানির নতুন পথ উন্মুক্ত হবে।
উপজেলা সদরের সমাজসেবক মোহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, নতুন হাই ভোল্টেজ উপকেন্দ্র চালু হলে চরফ্যাশন কেবল বিদ্যুৎনির্ভর অঞ্চলই হবে না। পাশাপাশি শিল্পকারখানা, কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে উঠবে। কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও উন্নত জীবনযাত্রার আলোয় চরফ্যাশনের প্রতিটি কোণা আলোকিত হয়ে উঠবে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির দায়িত্বরত সহকারী প্রকৌশলী বশির আহম্মেদ বলেন, নতুন এই উপকেন্দ্র চালু হলে সিস্টেম লস ও ওভারলোড সমস্যা দূর হবে। এতে ঢালচর, মনপুরা, চর লক্ষ্মী, চর মনতাজ, চর কুকরিসহ উপকূলীয় এলাকায় ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ও স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি দ্রুত সংযোগ দেওয়ার জন্য কাজ করছে। আগে দক্ষিণাঞ্চলে চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ পাওয়া যেত। নতুন গ্রিড চালু হলে শিল্পকারখানা বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং উপকূলবাসীর আর্থসামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে।
চরফ্যাশন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এমাদুল হোসেন বলেন, হাই ভোল্টেজ বিদ্যুৎ প্রকল্পটি শুধু বিদ্যুতের ক্ষেত্রে নয়, পুরো উপজেলার শিল্প ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মৎস্য হিমাগার, শিল্পকারখানা ও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। উপজেলা প্রশাসন প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে।