চসিকের অর্থ আত্মসাৎ
সুবল বড়ুয়া, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৫ ১০:৫৩ এএম
মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন। প্রবা ফটো
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সাবেক প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুদ্দিনের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক ও তদন্ত কর্মকর্তা মো. বেনজীর আহমদ অধিকতর তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছেন। নতুন দাখিল করা চার্জশিটে সাইফুদ্দিনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির অনুরোধ জানান তিনি।
দুদক ও চসিক সূত্রে জানা যায়, সাইফুদ্দিনের দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র ছিল চট্টগ্রাম নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পোর্ট কানেকটিং রোডের উন্নয়ন প্রকল্প। এই প্রকল্পের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স রানা বিল্ডার্স লিমিটেড এবং মেসার্স রানা বিল্ডার্স অ্যান্ড ছালেহ আহমদ (জেভি) প্রায় ১০১ কোটি টাকার কার্যাদেশ পায়। কার্যাদেশ নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দুটি ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবিএল), কুমিল্লা শাখা থেকে ঋণ গ্রহণ করে। চুক্তি অনুযায়ী, চসিক থেকে প্রাপ্ত বিলের টাকা সরাসরি ব্যাংকের নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু চসিকের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সাইফুদ্দিন ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশ করে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেন। তিনি ব্যাংকের পরিবর্তে সরাসরি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে চেক ইস্যু করেন। মোট ২০টি চেকের মধ্যে মাত্র ছয়টি চেক ব্যাংক হিসাবে জমা হয়, যার পরিমাণ ছিল ১৯ কোটি ৭২ লাখ ৭৭ হাজার ২১৮ টাকা। বাকি ১৪টি চেকের ২৪ কোটি ৯১ লাখ ৯৬ হাজার ৩০৭ টাকা সরাসরি ঠিকাদারের নামে ইস্যু করা হয়। চেকের অফিস কপিতে ব্যাংক ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যৌথ নাম লেখা হলেও মূল চেকে শুধু ঠিকাদারের নাম লেখা হয়। এই সুযোগে ঠিকাদার সম্পূর্ণ টাকা তুলে নিয়ে কাজ অসম্পূর্ণ রেখে পালিয়ে যায়। যার ফলে চসিক বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয় এবং নগরবাসীকে পোহাতে হয় চরম ভোগান্তি।
এ ঘটনায় ২০২২ সালের ১০ মে দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. আনোয়ারুল হক বাদী হয়ে দুটি মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে এসব মামলায় সাইফুদ্দিনকে অন্তর্ভুক্ত করে চার্জশিট দেওয়া হলেও আদালত তা গ্রহণ না করে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। অবশেষে অধিকতর তদন্ত শেষে গত ১১ সেপ্টেম্বর তার বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা মো. বেনজীর আহমদ।
চার্জশিটে চসিকের ইমপ্রুভমেন্ট পোর্ট কানেকটিং রোড প্রকল্পের অলংকার থেকে নিমতলা পর্যন্ত সড়কের উন্নয়ন প্রকল্পের ৪ কোটি ২৪ লাখ ২৩ হাজার ৪২৯ টাকার ক্ষতিসাধন ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ইউসিবিএলের ২৪ কোটি ১৪ লাখ ৮৮ হাজার ৭৬০ টাকা ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগ তোলা হয়েছে সাইফুদ্দিনের বিরুদ্ধে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দুদকের পিপি মোকারম হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে চসিকের সাবেক প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সাইফুদ্দিনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। সামনে শুনানি হবে।’ চার্জশিটে সাইফুদ্দিন ছাড়াও আরও তিনজনকে অভিযুক্ত করার কথা জানান তিনি।
চার্জশিটে অভিযুক্ত অন্য আসামিরা হলেনÑ কুমিল্লার ঝাউতলার বাসিন্দা ও মেসার্স জাকির এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. জাকির হোসেন, ইউসিবিএল কুমিল্লা শাখার সাবেক এফভিপি অ্যান্ড হেড অব ব্রাঞ্চ এবং বর্তমানে প্রধান কার্যালয়ের স্পেশাল অ্যাসেটস ম্যানেজমেন্ট ডিভিশনের মো. সরোয়ার আলম, এনআরবি ব্যাংক লিমিটেডের এভিপি ও কুমিল্লা শাখার প্রধান এবং ব্যাংক এশিয়ার সাবেক এভিপি ও কুমিল্লা শাখা প্রধান মোহাম্মদ তোফায়েল।
চসিক ও দুদক সূত্রে আরও জানা যায়, সাইফুদ্দিনের বিরুদ্ধে পোর্ট কানেকটিং রোডের দুর্নীতি ছাড়াও একাধিক গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। জাইকা প্রকল্পের আওতায় মহেশখাল রোডের উন্নয়ন ও গার্ডার ব্রিজ নির্মাণের জন্য মোহাম্মদ মাঈনুদ্দিন বাঁশি নামে এক ঠিকাদারকে তিনি আইন-বহির্ভূতভাবে আট কোটি টাকা অগ্রিম দেন। ২০১৮-১৯ এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ঠিকাদার ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধিত বিল থেকে ভ্যাট ও আয়কর বাবদ ৮ কোটি ৩৬ লাখ ৬৪ হাজার ১০১ টাকা কেটে রাখলেও তা সরকারি কোষাগারে জমা দেননি। চসিকের অভ্যন্তরীণ তদন্তেও এই অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
চসিকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন থেকে কর্তন করা প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকাও তিনি নির্দিষ্ট হিসাবে জমা করেননি। ২০১৮ সালের জুন থেকে ২০২০ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ২৬ মাস ধরে প্রতি মাসে কোটি টাকারও বেশি অর্থ তিনি জমা দেননি। ফলে অবসরপ্রাপ্ত অনেক কর্মচারী তাদের প্রাপ্য টাকা পেতে চরম হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। করোনা মহামারির জন্য সরকারের দেওয়া তিন কোটি টাকা তিনি রাজস্ব তহবিলের সঙ্গে সংমিশ্রণ করেন, যা নিয়ে ডিভিশনাল কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্টস আপত্তি জানিয়েছিল।
সাইফুদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর প্রেক্ষিতে চসিকের পক্ষ থেকে একটি বিভাগীয় মামলা (নং-০১/২০২১) হয়েছিল। ওই মামলার তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। দুদকের মামলায় তিনি উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন নিতে ব্যর্থ হয়ে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করেন এবং পরে জামিন পান। নতুন দাখিল করা চার্জশিটে সাইফুদ্দিনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির অনুরোধ জানান তদন্ত কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে চসিকের সাবেক প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুদ্দিনের মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার ফোন ও মেসেজ দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি সাড়া দেননি।