মাশরুর মুর্শেদ, খুলনা
প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২৫ ১২:২৮ পিএম
ডুমুরিয়ার বরাতিয়া গ্রামে নিজ ক্ষেতে আগাম ফুলকপি হাতে কৃষক তাপস সরকার। প্রবা ফটো
সবজি উৎপাদনে সমৃদ্ধ খুলনার ডুমুরিয়া। উর্বর মাটি ও পরিশ্রমী কৃষকদের হাত ধরে এ অঞ্চল এখন ‘সবজির রাজধানী’ নামে পরিচিত। এ বছরও কৃষকরা আগাম ফুলকপি চাষ করে ব্যাপক লাভের মুখ দেখছেন। তাদের দাবি, স্থায়ীভাবে সংরক্ষণাগার থাকলে আরও বেশি লাভবান হতেন।
জানা যায়, গত বছরের জানুয়ারিতে ডুমুরিয়ার বরাতিয়া গ্রামের কৃষক তাপস সরকার হলুদ, বেগুন ও ফুলকপি চাষ করে আলোচনায় আসেন। এ বছরও তিনি আগাম ফুলকপি চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন। মাত্র ২০ শতাংশ জমিতে ৪০০টি ফুলকপির চারা লাগান। মাত্র ৬০ দিনের মাথায় ক্ষেত থেকেই দেড় লাখ টাকার বিক্রি করেন।
তাপস বলেন, আগাম সবজির দাম অনেক বেশি থাকে। ২০ শতাংশ জমিতে ৪০০ চারা রোপণ করেছিলাম শ্রাবণ মাসে (আগস্ট)। মাত্র ৬০ দিনে ক্ষেতেই দেড় লাখ টাকার ফুলকপি বিক্রি হয়ে গেছে। প্রতি চারায় গড়ে ১০ টাকা খরচ পড়েছে। অন্যান্য কিছু খরচ হয়েছে। ফলে ১ লাখ টাকারও বেশি লাভ হয়েছে।
তিনি জানান, সম্প্রতি আরও একটি ক্ষেতের ৩৮০০ চারার ফুলকপি বিক্রি করেছেন ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে। সেখানেও লাভ লক্ষাধিক টাকা ছাড়িয়েছে।
তাপসের মতে, এলাকায় যদি সবজির সংরক্ষণাগার থাকত, তাহলে এমন সময়ে বিক্রি না করে সংরক্ষণ করে আরও ভালো দাম পাওয়া যেত।
ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যানুসারে, চলতি বছর উপজেলায় প্রায় ৬০ হেক্টর জমিতে আগাম ফুলকপি চাষ হয়েছে। সবচেয়ে বেশি চাষ হয়েছে আটলিয়া ও খর্ণিয়া ইউনিয়নে। এছাড়া শোভনা, সাহস, শরাফপুর ও ভাণ্ডারপাড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন মাঠে এবং চিংড়িঘেরের আইলজুড়ে ফুলকপির পাশাপাশি চাষ হচ্ছে শিম, তরমুজ, বরবটি ও নানা রকম সবজি।
তিনি জানান, আগাম সবজি চাষের একটি বড় সুবিধা হলো বাজারমূল্য। যে সবজির দাম মৌসুমে ২০-৩০ টাকা কেজি, তা অফ সিজনে বিক্রি হয় ১০০ টাকা পর্যন্ত। ফলে তুলনামূলক কম জমিতেও কৃষকের আয় কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
খর্ণিয়া ইউনিয়নের ভদ্রাদিয়া গ্রামের সফল কৃষক প্রকাশ সরকার জানান, কয়েক বছর ধরে আগাম সবজি চাষ করে তিনি ভালো লাভ পেয়েছেন। এ বছর নিজের ও লিজ নেওয়া জমি মিলিয়ে পাঁচ বিঘায় প্রায় ২৫ হাজার ফুলকপির চারা লাগিয়েছেন। দুয়েক দিনের মধ্যেই বিক্রি শুরু করবেন। যদি ভারী বর্ষা (বৃষ্টি) না হয়, এ বছরও ভালো লাভ পাবেন বলে আশা প্রকাশ সরকারের।
তিনি আরও বলেন, আগাম চাষে ঝুঁকি বেশি হলেও বাজারে দাম থাকায় সে ঝুঁকি নিতে রাজি অনেক কৃষকই। তবে যদি স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণাগার বা কোল্ডস্টোর তৈরি হয়, তাহলে চাষিদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা আরও বাড়বে।
ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইনসাদ ইবনে আমিন জানান, এ উপজেলার কৃষকরা এখন আগাম সবজি উৎপাদনে দক্ষ হয়ে উঠেছেন। ফুলকপি, শিম, তরমুজ, টমেটো সব ক্ষেত্রেই তারা ভালো সাড়া ফেলেছেন। বিশেষ করে আগাম ফুলকপি চাষে কৃষক ব্যাপক লাভবান হয়েছেন।
তিনি বলেন, তাদের এই সাফল্যের পেছনে স্থানীয় কৃষি অফিসের পরামর্শ, হাইব্রিড বীজের ব্যবহার এবং সঠিক সময় সেচ ও সার প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লাভজনক এই চাষকে টেকসই করতে হলে সংরক্ষণাগার বা কোল্ডস্টোর নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। কারণ বাজারে চাহিদা কমলে বা অতিরিক্ত উৎপাদন হলে কৃষকদের অনেক সময় বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়।
তারা আরও বলেন, ডুমুরিয়া এখন শুধু সবজির রাজধানী নয়, এটি দেশের কৃষকের উদ্ভাবনী ক্ষমতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। যেখানে অল্প জমি, সীমিত পুঁজি, আর আগাম চাষের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কৃষকরা বদলে দিচ্ছেন নিজেদের ভাগ্য এবং দেশের অর্থনীতির চিত্র।