মো. ইউনুছ অভি, টেকনাফ (কক্সবাজার)
প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২৫ ১১:১১ এএম
আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৫ ১১:২৬ এএম
দুপুরের কাঠফাটা রোদে নাফ নদের পাড়ে স্বামী ও দুই ছেলের ফিরে আসার অপেক্ষায় মাবিয়া খাতুন। প্রবা ফটো
দুপুর দেড়টা, কাঠফাটা রোদ। নদীর পাড়ে বসে আছেন মাবিয়া খাতুন। পাশে তার ছোট ছেলে। তাদের চোখে উদ্বেগের ছাপ। দুজনের দৃষ্টি নদের ওপারে। দূরে মিয়ানমারের পাহাড়ের রেখা। সেই রেখার ওপারে কোথাও আরাকান আর্মির হাতে বন্দি হয়ে আছেন তার স্বামী ও দুই ছেলে। গত শনিবার দুপুরে এমন দৃশ্য দেখা গেছে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ জালিয়া পাড়া নাফ নদের পাড়ে।
মাবিয়া খাতুন কাঁপা কাঁপা গলায় বলেন, প্রতিদিনই এখানে এসে বসি থাকি। মনে হয়, হয়তো আজ ফিরবে তারা। নদীর ওই পারে ওদের খুঁজে বেড়ায় আমার চোখ। মনে অনবরত প্রশ্ন জাগেÑ কবে ফিরবে তারা? কিন্তু কোনো উত্তর পাই না। তিনি বলেন, সেই দিন সকালে মাছ ধরতে গিয়েছিল। রাতে আর ফেরেনি। নৌকায় আমার স্বামী ও দুই ছেলে রয়েছে। তারা দুই মাস ধরে আরাকান আর্মির হাতে বন্দি রয়েছেন। এখনও জানি না বেঁচে আছে কি না?
এখন প্রতিদিন দুপুরে তিনি এসে বসেন নাফের তীরে। কিছুক্ষণ চেয়ে থাকেন নদের ওপারে, তারপর ফিরে যান নিঃশব্দে। তার মতো অনেকেই এখন নাফের পাড়ে অপেক্ষা থাকেন, কখন ফিরবেÑ আরাকান আর্মির হাতে বন্দি থাকা স্বজনরা।
স্থানীয় প্রশাসন ও জেলেদের ভাষ্যমতে, নাফ নদ ও সাগরে মাছ শিকারের সময় আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে অন্তত ১১৬ জেলেকে আরাকান আর্মি অপহরণ করেছে। বিজিবির তথ্যমতে, চলতি বছরের ৯ মাসে ২৩৫ জেলেকে আটক ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি। এর মধ্যে ১২৪ জন ফেরত এসেছেন। আটকা রয়েছেন আরও ১১১ জন, যাদের মধ্যে ৬২ জন রোহিঙ্গা।
সর্বশেষ গত ৩১ আগস্ট সেন্টমার্টিন থেকে তিনটি নৌকাসহ ১৮ জেলেকে অপহরণ করে মিয়ানমারভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। তাদের মধ্য ৬৫ বছর বয়সি মদিনা খাতুনের দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জামাইও রয়েছে। সেন্টমার্টিনের গলাচিপার বাসিন্দা মদিনা খাতুন বলেন, আমার ছেলে জাহাঙ্গীর আর শাব্বিরকে নিয়ে গেছে। আল্লাহ! আমার ছেলেদের ফিরিয়ে দাও।
আরেক বন্দি জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী হুমাইরা বেগম বলেন, গর্ভবতী অবস্থায় এখন চরম অসহায় জীবন কাটাচ্ছি। স্বামী মাছ শিকারে গেলে তবেই পেটে ভাত জোটে। না গেলে অনাহারে থাকতে হয়। তারা দ্রুত না ফিরলে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে। এখন আমাদের দেখাশোনার কেউ নেই।
এদিকে সাগরে ২২ দিন মাছ ধরার সরকারি নিষেজ্ঞায় জেলে পল্লীদের অবসর সময় পার করছে মৎস্যজীবীরা। ফলে টেকনাফ পৌর এলাকার কাযুকখালিয়া ঘাট ও শাহপরীর দ্বীপ জালিয়াপাড়া-ঘোলারচর ঘাটে সারি বেঁধে নোঙর করা হয়েছে মাছ ধরার ট্রলার। ঘাটে জেলেদের চির পরিচিত কোলাহল নেই। কয়েকজন শ্রমিক নৌযান পাহারা দিচ্ছেন। আর কিছু জেলেকে জাল মেরামত করতে দেখা যায়।
শাহপরীর দ্বীপ ঘাটে কথা হয় হাফেজ উল্লাহ নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি বলেন, এখন মাছ ধরা বন্ধ, কিন্তু আমাদের ভয় হচ্ছে মিয়ানমারের আরাকান আর্মির। তারা (আরাকান আর্মি) আমাদের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের হাতে আমার বাবাসহ এখনও শতাধিক জেলে বন্দি রয়েছেন। যাদের ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ফলে আমরা সবাই চিন্তিত।
তিনি বলেন, আমার স্ত্রী নিয়ে আমরা দুজই চট্টগ্রামে এশিয়ান গার্মেন্টে চাকরিজীবী ছিলাম। তখন অফিস ঋণ নিয়ে বাবাকে মাছ ধরার নৌকা কিনে দিয়েছিলাম। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতে নৌকাসহ পরিবারের তিন সদস্যকে ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি। এখন ঋণের টাকা দিতে না পারায় চাকরি চলে গেছে। এখন আমরার পুরো পরিবার পথে নেমে এসেছে।
টেকনাফ কায়ুকখালীয়া ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি সাজেদ আহমদ বলেন, আরাকান আর্মির হাতে আমাদের শতাধিক জেলে আটকা রয়েছে। তাদের ফেরা নিয়ে আমরা খুব চিন্তিত। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, যাতে জেলেদের দ্রুত ফেরত আনা হয়। পাশশাশি সাগর আর নাফ নদে যাতে মাছ শিকারের সময় এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সেজন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
জানতে চাইলে টেকনাফের ইউএনও শেখ এহসান উদ্দিন বলেন, আরাকান আর্মির হাতে আটক জেলেদের ফেরত আনার চেষ্টা চলছে। মিয়ানমারের জলসীমায় মূলত মাছ বেশি পাওয়া যায়, যে কারণে জেলেরা ওই সীমানায় ঢুকে পড়েন। এ সময় জেলেদের আটক করা হয়। তাই আমরা এ বিষয়ে জেলেদের সচেতন করছি।
রামু বিজিবি সেক্টর কমান্ডার মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগে বাধা থাকায় জেলেদের ফেরাতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। তবে জেলেদের দ্রুত ফেরত আনার চেষ্টা চলছে।