জামালপুর সংবাদদাতা
প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:৫৩ পিএম
আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২৫ ১৬:০৩ পিএম
বিগত সময়ে জামালপুরে হাজার হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে আগত রোগীদের ওষুধ সংগ্রহের একমাত্র পথ ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো। এই সাঁকোর আশপাশে কয়েকশ’ মিটারের মধ্যে একাধিক আধুনিক সেতু নির্মাণ হলেও যেখানে হওয়া দরকার সেখানে হয়নি। দেশের উন্নয়ন হয় মানুষের দুভোগ কমাতেÑসেখানে সময়ের পরিক্রমায় সাঁকোর কপালে জুটেছে বাঁশ, কাঠ আর লোহার পেরেক। জেলা শহরের গুরুত্বপূর্ণ এমন স্থানে এ সাঁকো যেন বড্ড বেমানান। যার ফলে, প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাতে হয় হাসপাতালে আগত রোগী ও স্বজনদের।
২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল। শুধু জেলা নয়, পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো থেকেও রোগী আসেন নিয়মিত। ২৫০ শয্যার বিপরীতে দৈনিক গড়ে তিনগুণের অধিক রোগী ভর্তি থাকে এই হাসপাতালে। সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত নির্দিষ্ট ওষুধের বাইরে দিবারাত্রি যেকোনো সময় বিভিন্ন ওষুধ রোগীদের সংগ্রহ করতে হয় এ সাঁকো পথে। আর সেই সময় তাদের দিতে হয় এক কঠিন পরীক্ষা। জরাজীর্ণ বাঁশের সাঁকোতে নদী পার হয়ে কিনতে হয় প্রয়োজনীয় ওষুধ।
ভৌগোলিক দিক থেকে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের শাখা নদীর তীরে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের অবস্থান। হাসপাতালটি সামনে পাকা সড়কসংলগ্ন নদী। এক সময় নদীর তীরে পাকা সড়কের পাশে হাসপাতালকে কেন্দ্র করে ছোট বড় অনেক ওষুধের দোকান গড়ে উঠে। সর্বশেষ ২০০৭ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক সরকারি জায়গা দখলমুক্ত করা হয়। বুলডোজারে ভেঙে ফেলা হয় হাসপাতালের সামনে সকল অবৈধ স্থাপনা। পরবর্তী সময়ে ওষুধ ব্যবসায়ীরা সকলেই হাসপাতালের সামনে নদীর অপর পাড়ে ওষুধের ব্যবসা শুরু করেন। সেসময় নদী পারাপারের জন্য তারা নিজেরাই তৈরি করেন বাঁশের সাঁকো। তখন থেকেই প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে সেই বাঁশের সাঁকো পারাপার হতে শুরু করেন হাসপাতালে আগত রোগী ও তাদের স্বজনরা।
হাসপাতালে মাকে নিয়ে আসা মেলান্দহ উপজেলার আশেক মাহমুদ জানান, মাকে নিয়ে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে দুই দিন যাবত আছি। দিনে রাতে কয়েকবার ওষুধ আনতে সাঁকো পার হয়ে নদীর ওপাড়ে যেতে হয়। সাঁকোর দুইপাশে কোনো বেড়া নেই বল্লেই চলে; তাই যাতায়াতের সময় অনেকটা সতর্ক হয়ে চলতে হয়। তা না হলে, যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে ওষুধ কিনতে আসা স্থানীয় পাথালিয়া এলাকার লিমা বেগম জানান, হাসপাতালের সামনেই ব্রহ্মপুত্র নদ। এই জায়গা থেকে কয়েকশ মিটার পরেই একাধিক ব্রিজ থাকলেও হাসপাতালের সামনে কোন ব্রিজ নেই। তাই ওষুধ কিনতে খুবই ঝুঁকি নিয়ে সাঁকো পাোপার হতে হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক দোকানদার বলেন, বাঁশের সাঁকোটি নদীর তলদেশ থেকে অনেক উঁচু। মাঝে মাঝে ওষুধ ব্যবসায়ীরা এটার সংস্কার করলেও বছরের বেশিরভাগ সময় এটি ঝুঁকিপূর্ণ থাকে। এই সাঁকোতে দিনের বেলা চলাচল অনেকটা সহজ হলেও রাতে চলাচল করা কঠিন। সাঁকোতে কোনো প্রকার আলোর ব্যবস্থা নেই। যার ফলে, রাতে সাঁকো পার হওয়া খুব কষ্টসাধ্য। রাতে ওষুধ কিনতে আসা রোগীর স্বজনদের ছিনতাইয়ের কবলে পড়তে হয় প্রায়ই। একদিন এ এলাকাটি ছিল ছিনতাইয়ের অভয়ারণ্য বর্তমানে কমলেও…..।
স্থানীয় ওষুধ ব্যবসায়ী সোহানূর রহমান জানান, ২৪ ঘণ্টায় এই সাঁকো দিয়ে প্রায় ১০ হাজার লোক যাতায়াত করে। বিগত সময়ে সারা জেলার উন্নতি হলেও সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো আজও অবহেলিত পড়ে আছে। জেনারেল হাসপালের সামনে বাঁশের সাঁকো এরই বড় প্রমাণ। অনেক রোগী কিংবা রোগীর স্বজনরা ভয়ে বাঁশের সাঁকোতে উঠতে চায় না। তারা কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে তাদের প্রয়োজনীয় ওষুধ সংগ্রহ করে।
সততা ফার্মেসির স্বত্বাধিকারী মো. নূরুল ইসলাম জানান, ৩০ বছর ধরে হাসপাতালের সামনে ওষুধের ব্যবসা করে আসছেন তিনি। ২০০৭ সালে তাদের ওষুধের দোকান ভেঙে দেওয়া হয়। সেসময় তাদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তারপর থেকে নদীর ওপাড়ে অনেকেই দোকান ঘর ভাড়া নিয়ে ওষুধের ব্যবসা করে আসছেন। তবে ব্রিজের অভাবে তাদের ব্যবসা খানিকটা মন্দা।
তিনি আরও বলেন, এর আগে বেশ কয়েকবার হাসপাতালের সামনে ব্রিজ নির্মাণের জন্য সয়েল টেস্ট হয়েছে কিন্তু অদৃশ্য কারণে ওই জায়গায় এখনো্ ব্রিজ নির্মাণ হচ্ছে না।
জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, হাসপাতালে সরবরাহকৃত ওষুধ ছাড়াও অনেক ওষুধ রোগীদের বাহির থেকে কিনতে হয়। হাসপাতালের সামনে ওষুধের দোকান না থাকলে রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ সংগ্রহ করতে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে শহরের গেটপার এলাকায় যেতে হবে।
তিনি বলেন, যেহেতু হাসপাতালের সামনে নদীর ওপাড়ে ওষুধের অনেক দোকান রয়েছে, সেহেতু সেখানে একটি ব্রিজ নির্মাণ হলে রোগীদের যাতায়াত সহজলভ্য হবে।
জামালপুরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী রোজদিদ আহম্মেদ বলেন, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের সামনে বাঁশের সাঁকোতে হাসপাতালে আগত রোগীসহ স্থানীয়রা চলাচল করে সে বিষয়ে আমরা অবগত রয়েছি। বর্তমানে সেখানে ব্রিজ নির্মাণের কোনো তথ্য আমাদের কর্মপরিকল্পনা বা ডিপিবি'তে নেই। তবে কোনো প্রকল্পে যদি ডিপিবি সংশোধন হয়, তাহলে সরেজমিন পরিদর্শন করে ওই জায়গায় ব্রিজের প্রস্তাবনা পাঠালে ব্রিজটি ডিপিবির অন্তর্ভুক্ত হবে।
একটি দেশের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা মুষ্টিময় কতিপয় মানুষের উন্নতি নয়। উন্নয়ন এমন হওয়া উচিতÑ যা সমাজের সকলের জীবন যাত্রার মান পরিবর্তন ঘটাবে। তেমনি জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের আশপাশের এলাকাগুলোতে আধুনিক ব্রিজ নির্মাণ কতিপয় মানুষের উন্নতির দিকে ইঙ্গিত করে। সঠিক পরিকল্পনা ও পরিকল্পনার সঠিক মূল্যায়ন হলে হয়তো বা অনেক আগেই হাসপাতালের সামনে একটি ব্রিজ নির্মাণ হতো আর দুর্ভোগ ঘুচে যেত প্রতিদিন হাজারো মানুষের।