রাসেল মাহমুদ, বরগুনা
প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৫৩ এএম
‘এক সময় ঘর ছিল, জমি ছিল আর এহন তা সব নদীতে খাইছে। এখন বাঁধও ভাঙে, মনও ভাঙে।’ চোখ মুছতে মুছতে কথাগুলো বলছিলেন বেতাগীর বৃদ্ধ হাশেম আলী। বরগুনা উপকূলের মানুষের জীবন যেন এক অনন্ত সংগ্রাম। জলোচ্ছ্বাস, বন্যা আর নদীভাঙনের সঙ্গে লড়াই করেই টিকে থাকা এই মানুষগুলোর ভরসার জায়গা ছিল বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ।
কিন্তু সেই বাঁধ এখন আর নিরাপত্তা নয়, বরং ভয় ও অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় প্রতি বছর জেলার বিভিন্ন স্থানে বাঁধ ভেঙে যায়। সরকারি হিসাবে বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণে বছরে গড়ে ৮ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়। কিন্তু বাস্তবে তার সুফল খুব একটা মেলে না। একটু বৃষ্টি বা জোয়ার এলেই বাঁধের দুর্বল অংশ ভেঙে পড়ে। তলিয়ে যায় গ্রামের পর গ্রাম।
জরুরি বাঁধ সংস্কারের নামে প্রতি বছর গড়ে ব্যয় হচ্ছে অন্তত ৮ কোটি টাকা। কিন্তু কিছু হলে পানিতে ভেসে যাচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোটি টাকার প্রকল্প। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংস্কারের নামে যেসব প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে এতে সাময়িকভাবে কিছুটা উপকারে এলেও স্থায়ীভাবে উপকূলীয় নিঃস্ব হওয়া মানুষের জানমাল রক্ষায় কাজে আসে না। কিছুদিন যেতে না যেতেই পানিতে ভেসে যায়। সংস্কারের নামে সংস্থাটি যেসব প্রকল্প নেয়, এগুলো সাময়িকভাবে কিছুটা উপকারে এলেও উপকূলীয় মানুষের জানমাল স্থায়ীভাবে রক্ষা হয় না। তাই টেকসই বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের দাবি জেলার লাখো মানুষের।
জনসাধারণের এমন অভিযোগের বিপরীতে পাউবো কর্মকর্তাদের দাবি, পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকায় বাঁধের জরুরি মেরামত করা হচ্ছে।
পালের বালিয়াতলীর জেলে নাসির উদ্দীন গতকাল শুক্রবার বলেন, এখন ভাঙতে ভাঙতে আমাদের ঘর উঠানোর জায়গা আর নেই।
নাসিরের পরিবারের জমি ছিল তিন একর। দুই দফায় তিনি বাড়ি স্থানান্তর করতে বাধ্য হন। এখন বাঁধের পাশে ছোট ঘর করে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে থাকছেন।
সম্প্রতি দেখা গেছে, চার বছর আগেও যেখানে লোকজনের বসতভিটা, বাজার ছিলÑ এখন তা পায়রা নদীতে তলিয়ে গেছে। ভাঙনরোধে পাউবো একাধিকবার জরুরি মেরামত করলেওÑ তা কোনো কাজেই আসছে না। এ বছর জরুরি বাঁধ মেরামতের কাজ চলছে। তবে বাঁধের পাশ থেকে মাটি কেটে বাঁধ মেরামত নিয়ে নানা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
বরগুনায় বেড়িবাঁধের দৈর্ঘ্য ৮০৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে অন্তত দুই কিলোমিটার বাঁধ খুব ঝুঁকিপূর্ণ বলে পাউবো কর্মকর্তারা জানান। তাদের ভাষ্য, পাঁচ বছরে বরগুনায় জরুরি বাঁধ মেরামতে খরচ হয়েছে ৪০ কোটি ১৯ লাখ ৪১ হাজার টাকা। এর মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে ছয় কোটি ১৭ লাখ ৩৫ হাজার, ২০২১-২২ অর্থবছরে সাত কোটি ৯৮ লাখ ৮০ হাজার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দুই কোটি ১২ লাখ ২৬ হাজার, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২০ কোটি ২৪ লাখ ও ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে তিন কোটি ৬৭ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় রেমাল আঘাত হানার পর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেশি খরচ হয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বলছেন, টেকসই বাঁধ নির্মাণের পরিবর্তে বছরে বছরে কেবল অস্থায়ী মেরামত চলছে, যা প্রকৃত সমাধান নয়।
পাউবোর তথ্য বলছে, জেলার তালতলীর জয়ালভাঙ্গা, নলবুনিয়া ও নিশানবাড়িয়া এলাকায় ২০১৮ সাল থেকে বেড়িবাঁধ রক্ষা, সাইক্লোন ও উচ্চ জোয়ারের পানি প্রবেশ রোধে এক হাজার ১০০ মিটার বেড়িবাঁধ সংস্কারে খরচ হয়েছে দুই কোটি ৭৫ লাখ টাকা। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব সংস্কার তাদের বাপ-দাদার বসতবাড়ি ও ফসলি জমি রক্ষায় কাজে আসেনি। বাঁধ মেরামত করতে না করতেই তা বিলীন হয়ে যাচ্ছে খরস্রোতা পায়রা নদীতে।
পাথরঘাটা উপজেলার তাফালবাড়িয়া এলাকার কৃষক সুলতান হোসেন বলেন, বাঁধে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়, কিন্তু জলোচ্ছ্বাসে আমাদের ঘর ভাইসা যায়।
বরগুনা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল হান্নান বলেন, এক কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ব্লক দিয়ে স্থায়ীভাবে মেরামত করতে অন্তত ১০০ কোটি টাকা দরকার। কিন্তু উপকূলীয় অঞ্চলে যে পরিমাণ বাঁধ প্রতি বছর ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা সারতে সেভাবে বরাদ্দ মেলে না।