আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২৫ ১০:৪৩ এএম
চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (সিইপিজেড) এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভের জেরে প্যাসিফিক গ্রুপের আটটি কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। দেশের অন্যতম বৃহৎ পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘প্যাসিফিক জিনস গ্রুপ’ গত বৃহস্পতিবার এক ঘোষণায় জানায়- শ্রমিকদের সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অনুকূল কর্মপরিবেশ না থাকায় তাদের আটটি কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এদিকে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গুজব ছড়িয়ে যেভাবে পরিস্থিতি ঘোলাটে করা হয়েছে, তাতে এটা পরিষ্কার যে পরিকল্পিতভাবে কেউ প্যাসিফিক জিনসকে ঘিরে একটি অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করেছে। পেছন থেকে কলকাঠি নেড়েছে।
গত এক সপ্তাহ ধরে প্রতিষ্ঠানটির শ্রমিকদের মধ্যে বিক্ষোভ ও অসন্তোষ ছিল। কারখানার ভেতরে শ্রমিকদের দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। একপর্যায়ে কিছু শ্রমিক কাজ বন্ধ রেখে মারামারি, ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িয়ে পড়ে। এর প্রেক্ষিতে কারখানাগুলো বন্ধের নোটিসে প্যাসিফিক কর্তৃপক্ষ জানায়, ‘১৪ অক্টোবর থেকে কিছু শ্রমিক বেআইনিভাবে কর্মবিরতি পালন করে। বারবার নির্দেশনা দেওয়ার পরও তারা কাজে ফেরেনি। বরং ১৫ ও ১৬ অক্টোবরও উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করে এবং নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালায়।’
বিজ্ঞপ্তিতে তারা আরও বলে, ‘শ্রমিকদের এ ধরনের আচরণ বাংলাদেশ ইপিজেড শ্রম আইন ২০১৯ অনুযায়ী ধর্মঘট বেআইনি হিসেবে গণ্য হয়। এ অবস্থায় কারখানার কার্যক্রম চালু রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ায় কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
কাজ বন্ধ রাখা প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছেÑ প্যাসিফিক জিন্স-১, প্যাসিফিক জিন্স-২, প্যাসিফিক অ্যাটায়ারস, প্যাসিফিক অ্যাক্সেসরিজ, প্যাসিফিক ওয়ারকওয়্যারস, ইউনিভারসেল জিন্স, এইচটি ফ্যাশন, জিন্স ২০০০। কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (সিইপিজেড) কর্মরত ৩৫ হাজারের বেশি শ্রমিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল।
এদিকে এ ঘটনায় বাইরে থেকে শ্রমিকদের কোনো ইন্ধন দেওয়া হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে তদন্ত করছে পুলিশ। তবে আন্দোলনরত শ্রমিকরা বলছেন, কারখানার মালিক পক্ষ ও পুলিশ তাদের হয়রানি করছে। তবে পুলিশ বলছে, শ্রমিকদের হয়রানির কোনো বিষয়ই ছিল না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ইপিজেডের ভেতরে শিল্পপুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। সে ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে ইপিজেড থানায় একটি মামলা করে। মামলায় এখনও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। মামলাটি বর্তমানে শিল্পপুলিশ তদন্ত করছে। মামলার তথ্য-সংগ্রহ নিয়েই শ্রমিকদের অসন্তোষের শুরু। শ্রমিকদের দাবি, তাদের নামে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।
মামলার বিষয়ে চট্টগ্রাম শিল্পপুলিশের সুপার আবদুল্লাহ আল মাহমুদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে চারটি পুলিশ ভ্যানে আগুন দেওয়ায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। সেই মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে বিভিন্ন থানায় ইনকোয়ারি স্লিপ পাঠানো হয়েছে। এটা একেবারেই স্বাভাবিক একটা অংশ তদন্তের। আর এটাকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের উত্তেজিত করা হয়েছে। পরে আমরা তাদের ব্রিফ করেছি। জানিয়েছি, তদন্তে যদি সংশ্লিষ্টতা পাওয়া না যায় তাহলে কাউকে হয়রানি করা হবে না, কারও কোনো অসুবিধা হবে না। শুধু তদন্তে যাদের অপরাধ পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শ্রমিকরা কনভিন্সড হয়ে কাজে ফিরে গেলেও গত বৃহস্পতিবার সকালে গুজব ছড়িয়ে আবারও পরিস্থিতি উত্তপ্ত করা হয়।’
এ দিন সংঘর্ষে দুই নারীসহ ৭ শ্রমিক আহত হলে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়। এর মধ্যে তিনজনের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ে। চট্টগ্রাম শিল্পপুলিশের পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, ‘ওই সময়ে একটা ভিডিওতে কাফনের কাপড়ে মোড়ানো তিনটা দেহ দেখিয়ে বলা হচ্ছিল তিন শ্রমিক মারা গেছে। তখন আমরা খবর নিয়ে কনফার্ম করি এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা কারখানা বন্ধের চিঠি পেয়েছি। শ্রমিকদের মধ্যে কিছু অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আছে। তবে বাইরে থেকে কেউ ইন্ধন দিচ্ছে কি না, সেটি আমরা তদন্ত করছি।’
যে পরিকল্পিত উস্কানির কথা বলা হচ্ছে তার নেপথ্যে কারা কিংবা বিষয়টি তদন্তে পুলিশের ভূমিকা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই ঘটনার নেপথ্যে যারা আছে তাদের আমরা শনাক্ত করতে পেরেছি। বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি।’
এদিকে কারখানা বন্ধের ঘটনায় হতাশ শ্রমিকরা বলছেন, পরিবার নিয়ে তাদের চরম দুর্দশায় পড়তে হবে। তারা চান দ্রুত কারখানা খুলে দেওয়া হোক। অন্যদিকে কারখানার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ মুহূর্তে কারখানা খোলা রাখলে আরও বড় অঘটনের আশঙ্কা রয়েছে।