জহুরুল ইসলাম, কুষ্টিয়া
প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২৫ ১০:৪০ এএম
আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২৫ ১৯:১৬ পিএম
‘সৃষ্টিকর্তার সন্ধানে আমরা হিল্লি-দিল্লি ঘুরে বেড়াই। তার সান্নিধ্য পেতে কত পথ, কত মত। কিন্তু মানুষকে ভালোবাসলেই তাকে পাওয়া যায়।’ লালন সাঁই তার গানে সে কথাই তুলে ধরেছেন- কথাগুলো বলছিলেন লালন আখড়াবাড়িতে আসন পেতে বসা প্রবীণ বাউল বীর মুক্তিযোদ্ধা নহির উদ্দিন শাহ।
ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৫তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে গতকাল শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে প্রথমবারের মতো জাতীয় দিবস হিসেবে আয়োজিত তিন দিনের লালন স্মরণোৎসব। এদিন সন্ধ্যায় আখড়াবাড়ির মরা কালীগঙ্গা নদীর তীরে উন্মুক্ত মঞ্চে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উৎসবের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মফিদুর রহমান, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন। মুখ্য আলোচক ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান লেখক ও গবেষক গায়ত্রী চক্রবর্তী। সভাপতিত্ব করেন কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক আবু হাসান মোহাম্মদ আরেফিন।
১২৯৭ বঙ্গাব্দের ১ কার্তিক ফকির লালন সাঁই দেহত্যাগ করেন। তার অনুসারী ভক্ত বাউল সাধকরা দিনটিকে লালন স্মরণোৎসব হিসেবে পালন শুরু করেন। সে ধারা আজও ধরে রেখেছেন তার অনুসারী বাউল-বৈষ্ণবরা।
উৎসব শুরুর কয়েক দিন আগে থেকেই দেশের নানা প্রান্ত থেকে কয়েক হাজার বাউল জড়ো হয়েছেন ছেঁউড়িয়ার লালনধামে। ভাবগান আর বাউল আচারের যজ্ঞ পালন ছাড়াও বাউল পথ ও মতের দীক্ষাও নিচ্ছেন অনেকে। লৌকিক অনুষ্ঠানের বাইরে লালনভক্তরা এ অনুষ্ঠানে নিজস্ব কিছু রীতিনীতি পালন করেন। চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী শুক্রবার সন্ধ্যায় অধিবাসের মধ্য দিয়ে তাদের এই কর্মকাণ্ড শুরু হয়। আজ শনিবার সকালে বাল্যসেবা অর্থাৎ দই ও চিড়া নাশতা দেওয়া হবে বাউলদের। এর পর দুপুরে তাদের দেওয়া হবে পূর্ণসেবা। এই সেবার আওতায় বাউলরা খাবেন ভাত, ডাল, পঞ্চব্যঞ্জন ও মাছ। এ ছাড়া আজ লালন মতে নতুন করে দীক্ষিতদের শিষ্যত্ব প্রদান করবেন তাদের নিজ নিজ গুরুরা।
অধিকাংশ প্রবীণ বাউল বসেছেন লালন ফকিরের আখড়ার পাশেই। বাউলদের একেকটি পরিবার আস্তানা গেড়েছেন। সেখানে মূল যিনি গুরু তাকে ঘিরে বসেছেন নবীনরা। আখড়াবাড়িতে কথা হয় কুষ্টিয়ার মিরপুরের বাউল ফারুক মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সহজ মানুষ খোঁজা আর ভজার কাজে দীক্ষা নিয়েছি। এই পথেই সারা জীবন কাটাতে চাই।’
বাউল দলিল ফকির বলেন, ‘আজকের দিনটি শোকের। আমরা শোক পালন করি। গুরুকে স্মরণ করি তার গানের মাধ্যমে। উৎসবে দাওয়াতের প্রয়োজন হয় না। মনের মধ্যে আগে থেকেই দিনটি গাঁথা থাকে। তার টানেই চলে আসি।’
বাউল সাধুদের পাশাপাশি আখড়াবাড়ির স্মরণোৎসবে যোগ দিয়েছেন হাজারো দর্শনার্থী। আখড়াবাড়িতে কথা হয় সিরাজগঞ্জ শহরের একদল বাউলের সঙ্গে। তারা বলেন, এখানে এলে মানুষের আলাদা একটা রূপ চোখে পড়ে। মানুষকে ভালোবাসার মন্ত্র শেখা যায়। ঢাকা থেকে আসা দর্শনার্থী জুলহাস কবির বলেন, ‘উৎসব দেখতে এসেছি। গান শুনতে ভালো লাগছে। তবে খাবার ও আবাসিক হোটেল মালিকরা কয়েকগুণ বেশি অর্থ নিচ্ছেন।’ একই অভিযোগ আরও অনেকের। তারা বলছেন, অন্য সময় যেসব হোটেলে সাধারণ মানের কক্ষ এক হাজার টাকায় পাওয়া গেলেও এখন দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা নিচ্ছেন। এসি কক্ষ একলাফে উঠেছে চার হাজার টাকায়।