আরফিনুল ইসলাম, নীলফামারী
প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:০৫ পিএম
আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৫ ১৯:১৪ পিএম
কাগজে-কলমে চলছে কোটি টাকার প্রকল্প, অথচ মাঠে নেই কার্যক্রম। নীলফামারী জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা ও দায়িত্বরত এনজিও'র বিরুদ্ধে সরকারের অর্থ আত্মসাৎ ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। দ্রুত সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি স্থানীয়দের।
‘শিশুরাই রত্ন, করব যত্ন’ স্লোগানে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ শিশু একাডেমি শিশুদের প্রারম্ভিক বিকাশ ও সুরক্ষা এবং সাঁতার সুবিধার ‘আইসিবিসি’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। নীলফামারী জেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (লোকাল আইডিয়া ফর এমপাওয়ারমেন্ট) লাইভ। তবে, আইসিবিসি প্রকল্পটি নীলফামারীতে এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। জেলা শিশু একাডেমির শীর্ষ কর্মকর্তা এবং একাধিক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রতিবেদন বলছে, লাইফ এনজিও’র প্রায় সকল কার্যক্রম অচল। অন্যদিকে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাহিদা পূরণ করতে না পারায় এমন প্রতিবেদন বলছেন এনজিও কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়িত্বরত লাইভ এনজিওর উপ-পরিচালক সুভাষচন্দ্র পাল বলেন, একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমার কাছে একটা দাবি করেছিল। সেটা দিতে না পারায় তিনি এমন প্রতিবেদন দিয়েছেন । অন্যদিকে, জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, অর্থ বরাদ্দের প্রত্যায়নের জন্য গেলে তিনি আজ নয় কাল এভাবে কালক্ষেপন করছেন। এই কর্মকর্তার আরও বলেন, যখন একজন মানুষকে বারবার ঘোরানো হয়, তখন বোঝাই যায় এখানে একটা উদ্দেশ্য আছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে জেলায় সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নেই বললেন সহকারি প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো. মাদুল মিয়া।
জানা গেছে, নীলফামারীর তিন উপজেলায় গড়ে ওঠা শিশু যত্ন কেন্দ্রেগুলোর অস্তিত্ব শুধুমাত্র কাগজে-কলমেই। সাধারণ মানুষ তো নয়ই, এমনকি দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও জানেন না শিশুযত্ন কেন্দ্রের খবর। হাতেগোনা কয়েকটি শিশুযত্ন কেন্দ্র ছাড়া সাঁতার প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি কোথাও। প্রকল্পের আওতায় জেলার ডিমলা, কিশোরগঞ্জ ও সৈয়দপুর উপজেলার এক থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য ৫০০টি শিশু যত্ন কেন্দ্র এবং পানিতে ডুবে মৃত্যু থেকে সুরক্ষায় ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের জীবন রক্ষাকারী ৫০টি সাঁতার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, সেই সঙ্গে অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সভার মাধ্যমে শিশুর যত্ন, বিকাশ ও সুরক্ষার বিষয়ে তথ্য প্রদান করার কথা থাকলেও বাস্তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কার্যক্রমের কোনো অস্তিত্ব নেই।
শুধু তাই নয়, শিশু যত্নকারীদের বেতন না হওয়া এবং এনজিও কর্মকর্তাদের নানা অব্যবস্থাপনা, উপজেলা কর্মী নিয়োগে অর্থনৈতিক লেনদেন এমনকি প্রকল্পে নিয়োজিত নারী কর্মীর সঙ্গে পরিচালক সুভাষচন্দ্র পালের অনৈতিক সম্পর্কে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ। অভিযোগ রয়েছে, শিশুদের জন্য সরকারের দেয়া নানা খেলনা সামগ্রী এনজিওর কাছে দেয়া হলেও সেগুলো শিশুদের মাঝে বন্টন করা হয়নি।
সৈয়দপুর উপজেলার ১ নম্বর কামারপুকুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, আইসিবিসি প্রকল্প সম্পর্কে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। এ বিষয়ে আমি কিছুই জানিনা বা কখনোই শুনি নাই। কোনো এনজিও কখনোই আমার কাছে আসেনি। অথচ নিয়ম অনুযায়ী মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ শিশু একাডেমির বাস্তবায়নে গ্রাম ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে এনজিওর পক্ষ থেকে তাকে এগুলো জানানোর কথা।
কিশোরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রীতম সাহা জানালেন, প্রতিমাসে আমাদের এখানে একটি এনজিও বিষয়ক সমন্বয় সভা হয়। যেখানে এই উপজেলায় যতগুলো এনজিও কাজ করে সকলেই সেই সভায় উপস্থিত থেকে তাদের কার্যক্রমগুলো অবহিত করে। কিন্তু সভায় লাইভ নামের কোনো এনজিওর প্রতিনিধিকে পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, অবাক করার বিষয় হলো- উপজেলা বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি হয়েও উপজেলায় লাইফ এনজিও'র কার্যক্রম সম্পর্কে আমি অবগত নয়।
15-68ef4881e77b4.jpg)
বিষয়টি শোনার পর তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থার গ্রহণের জোরালো দাবি জানালেন সৈয়দপুর উপজেলার ১ নম্বর কামারপুকুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মো. জাহিদুর হক।
সৈয়দপুর উপজেলা ইসিসিডি অফিসের শাহিনা বেগম অভিযোগ করে বলেন, ২০২৪ সালে চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই জেলায় এনজিওর উপ-পরিচালক সুভাষচন্দ্র পাল আমার দিকে খারাপ নজরে তাকান। দেন অনৈতিক শারীরিক সম্পর্কের প্রস্তাব। আমি রাজি না হওয়ায় পরবর্তীতে এপিসি আয়েশার সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ান। আমার বাসায় এসে দুজনে সময় কাটাতে চান। আমি রাজি না হলে নয় মাসের বেতন না দিয়েই আমাকে চাকরি থেকে বাদ দেয়া হয়।
স্থানীয় বিউটি বেগম বললেন, গত ছয় মাস ধরে আমার বাসায় একটি শিশু যত্ন কেন্দ্র রয়েছে। তবে গত তিন মাস ধরে এটির কার্যক্রম বন্ধ। শুনেছি যত্নকারীদের ঠিকমতো বেতন দেয়া হচ্ছে না, তাই তারা আর আসেন না।
সহকারী শিশু যত্নকারী জেসমিন আক্তার জানালেন, আমাদের কেন্দ্রটিতে বিদ্যুত সংযোগ নাই, নেই কোনো ফ্যান। গরমে কষ্ট হওয়ায় অনেক বাচ্চাই যত্ন কেন্দ্রে আসতে চায় না। শিশুরা চকলেটের লোভে যত্ন কেন্দ্রে আসে, সেক্ষেত্রে বাচ্চাদের টিফিনের ব্যবস্থা করা গেলে ভালো হতো।
তিন বছর বয়সী মালিহার মা নাহার সুলতানা বলেন, বাচ্চাদেরকে যত্ন কেন্দ্রে পাঠাই। কিন্তু সেখানে স্যান্ডেল রাখার জন্য জায়গা নেই। বসার জন্য ভালো পরিবেশ নেই। অনেক কেন্দ্রেই কারেন্ট, ফ্যান এমনকি লাইটও নেই। কিছু কিছু কেন্দ্রে বর্ষাকালে পানিও পড়ে। তিনি বলেন, শিশু যত্ন কেন্দ্রে গিয়ে আমার মেয়ে স্যান্ডেল হারানোর পর থেকে সে আর যেতে চায় না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক যত্নকারী জানান, তাদের নামে শিশু যত্ন কেন্দ্র রয়েছে, যদিও সেগুলোর কার্যক্রম নেই। আমাদের নামে শিশু যত্ন কেন্দ্র করে যদি এনজিও কর্মকর্তারা টাকা তছরুপ করেন তাহলে এটা বাচ্চাদের সঙ্গে অন্যায়।
এদিকে, কামারপুকুর বাগান বাড়ি এলাকার সাঁতার প্রশিক্ষক রোবিনা আক্তার জানালেন, জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সাঁতার শেখানোর সময়। তবে নয় মাস কাজ করে তিন মাসের বেতন পেয়েছেন। কষ্ট করে অনেক শিশুকে সাঁতার শেখালেও সময় মতো বেতন না পাওয়ায় সাঁতারের কার্যক্রম বন্ধ রেখেছেন তিনি।
মোটা অংকের টাকা না দিলে অর্থ বরাদ্দ পত্রে স্বাক্ষর করেন না জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা এনজি কর্মকর্তার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ দাবির অভিযোগ অস্বীকার করে আইসিবিসি প্রকল্পের জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা বলেন, যখন আমরা পরিদর্শনে যাই বলে দেয়া হয় যে কর্মকর্তারা আসছে যে কারণে সবকিছু ঠিক পাই। আর বাংলাদেশের সব কালচারই তো এমন যখন কেউ ভিজিটে যায় তখন সব ঠিকঠাক থাকে আর ভিজিটের বাইরে অনেকাংশেই গ্যাপ থাকে।
প্রশিক্ষক ও যত্নকারীদের বেতন না দেয়ায় অনেক কেন্দ্র বন্ধ। এমন প্রশ্নের জবাবে লাইভ এনজিওর জেলা উপ-পরিচালক সুভাষ চন্দ্র পাল বলেন, সময় মতো অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় এ অবস্থা। তাছাড়া মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গেলে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকবেই। শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা বরাদ্দের প্রত্যয়ন পত্রে সময় মত স্বাক্ষর না করায় সময় মত বিল তুলতে পারেননি। আর এটিই সব সমস্যার মূল কারণ বলে জানালেন তিনি।
এ বিষয়ে তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস প্রকল্প বাস্তবায়নের সভাপতি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালে নীলফামারীতে আইসিবিসি প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রকল্পটির বাস্তবায়নে জেলায় প্রতি বছর ব্যয় হয় ৬ কোটি টাকার বেশি। এখন পর্যন্ত এ প্রকল্পে মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। যে প্রকল্প শিশুদের সুরক্ষার কথা বলে, সেটিই আজ শিশুদের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। সুরক্ষার নামে কোমলমতি শিশুদের মুখের খাবার কেড়ে নিয়ে হচ্ছে অনিয়ম আর দুর্নীতি। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। শিশুর যত্নের নামে যে লুটপাট চলছে দ্রুত তা বন্ধের দাবি স্থানীয়দের।