রাসেল মাহমুদ, বরগুনা
প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৩৬ এএম
মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞার ফাঁকে মঙ্গলবার নিজেদের জাল মেরামতে ব্যস্ত বরগুনার জেলেরা। Ñপ্রবা ফটো
মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে প্রতি বছরের মতো এবারও ৪ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সাগরে ইলিশ ধরা, পরিবহন ও বিপণনে জারি হয়েছে সরকারি নিষেধাজ্ঞা। তবে এই ২২ দিনের অবরোধে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন বরগুনার উপকূলীয় জেলেরা। মাছ ধরা যাদের একমাত্র জীবিকা, নিষেধাজনার ফলে তাদের আয়ে নেমেছে ধস। সরকার থেকে চাল বরাদ্দ মিললেও তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি তাদের। নগদ সহায়তার অভাবে বহু পরিবার ঋণের বোঝায় জর্জরিত। জেলেরা বলছেন, নিষেধাজ্ঞা মেনে চলেও তারা পড়েছেন অর্থনৈতিক দুরবস্থায় আর নিষিদ্ধ সময়ে গভীর সমুদ্রে ট্রলিং ট্রলারের অবাধ চলাফেরা এ কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
স্থানীয় জেলেরা জানান, ইলিশ সাধারণত মিষ্টি পানি এলাকায় নদীর উজানে (যেখানে স্রোত মাঝারি ও তলদেশ বালুময়) ডিম ছাড়ে। ইলিশের ডিম পাড়ার মূল সময় হলো অশ্বিন ও কার্তিক অর্থাৎ সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর মাস। প্রতি বছর অক্টোবর মাসে মা ইলিশের প্রজনন মৌসুমে এমন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। চলতি বছরও বরগুনাসহ অন্যান্য উপকূলীয় এলাকায় ৪ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে।
এদিকে মাছ ধরা এসব জেলেদের প্রধান উপার্জনের উৎস। জেলেদের দাবি, সরকার তাদের সহায়তায় যে ২৫ কেজি করে চাল বিতরণ করেÑ তা দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। নগদ সহায়তার অভাবে অনেক পরিবার ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়ছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের দাবি, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন হলে পরের মৌসুমে নদী ও সাগরে বড় আকারের ইলিশ বেশি ধরা পড়ে। এতে জেলেদের আয়ও বাড়ে।
বরগুনা জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ছয়টি উপজেলায় সরকারি নিবন্ধিত জেলে পরিবার রয়েছে ৪০ হাজার ৫২১টি। জেলা ট্রলার মালিক সমিতির হিসাবে জেলে রয়েছেন অন্তত ৪৫ হাজার। তবে নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত মিলিয়ে বরগুনায় জেলের সংখ্যা এক লাখেরও বেশি।
অর্থনৈতিক সংকটে পড়া এসব জেলেরা বলছেন, নিষেধাজ্ঞার সময় আয় বন্ধ থাকলেও ঋণ ও কিস্তির চাপ বন্ধ থাকে না। অনেকেই বাধ্য হয়ে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সাগরে মাছ ধরতে যাচ্ছেন জীবিকার তাগিদে।
পাথরঘাটা উপজেলার কালমেঘা গ্রামের জেলে মো. মতিন বলেন, এতদিন নদীতে ইলিশ ছিল না, এখন ইলিশও নাই, পেটে ভাতও নাই। ঋণে ডুবে আছি। মনে হয় জেলে পেশা একদিন বিলুপ্ত হইয়া যাইব।
পালের বালিয়াতলী গ্রামের জেলে মো. নাসির বলেন, আয় বন্ধ, আমরা এখন দুঃখের সাগরে ভাসতেছি, হয়তো একদিন তলাইয়া যামু। তখন মরণ ছাড়া উপায় থাকব না।
বালিয়াতলীরই আরেক জেলে সজিব বলেন, জাল আর নৌকা ঠিক করতে ঋণ নিতে হইছে। এখন আয় নাই, বাজার করতে পারি না। নিষেধাজ্ঞা শেষে মাছ পাইলে হয়তো ঋণ শোধ করতে পারমু। সরকার খালি চাল দেয়, কিন্তু খালি চাল দিয়া সংসার চলে না।
বড় জালের মাধ্যমে সমুদ্রের তলদেশ বা মাঝামাঝি স্তর ঘেঁষে মাছ ধরে ট্রলিং ট্রলার। ভারী জাল ও লোহা টেনে নিয়ে যায়, এতে সমুদ্রের তলদেশের প্রবাল, সামুদ্রিক ঘাস ও জীববসতি নষ্ট হয়। ট্রলারগুলো স্বল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ মাছ ধরে, ফলে ছোট নৌকায় জেলেদের ভাগে মাছ কম পড়ে। এর ফলে অর্থনৈতিক ক্ষতি শিকার হয় জেলেরা। তাই নিষিদ্ধ মৌসুমে ট্রলিং বন্ধ করা এবং নিয়ম অনুসারে ট্রলিং ট্রলার গভীর সমুদ্রে মাছ শিকার করা উচিত বলে মনে করেন জেলেরা।
পোটকাখালী গ্রামের জেলে হানিফ বলেন, নিষেধাজ্ঞার পর মা ইলিশ ডিম ছাড়ে, বাচ্চা বড় হওয়া পর ট্রলিং ট্রলারগুলো সব ধরে ফেলে। নিষেধাজ্ঞা দিয়ে লাভ কী হলো। ট্রলিং ট্রলার গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার কথা থাকলেও তারা মাঝামাঝি স্তর ঘেঁষে মাছ ধরে। ট্রলিং ট্রলার নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে নিষেধাজ্ঞার পর বড় আকারের ইলিশ ধরা পড়বে না। না খেয়ে মারা পড়বে ছোট নৌকায় জেলেরা।
জেলার মৎস্য কর্মকর্তা মো. মহসীনের বলেন, জেলেদের জীবনমান উন্নয়নে আমরা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি। প্রতিদিন সারা রাত আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। ৩৭ হাজার ৯৯৫ জন জেলে পরিবারের মধ্যে ২৫ কেজি চাল বিতরণ করা হয়েছে। মাছ ধরা নিষেধাজ্ঞার সময় সব বাহিনীর সহযোগিতার নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আশা করি পরের মৌসুমে নদী ও সাগরে বড় আকারের ইলিশ বেশি ধরা পড়বে।