× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

খুলনাবাসীর সেবার নামে আরেক দুর্নীতির প্রস্তুতি!

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব, ঢাকা ও মাশরুর মুর্শেদ, খুলনা

প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০২৫ ১৫:১৭ পিএম

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৫ ১৫:২৪ পিএম

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

খুলনা ওয়াসায় আবারও ‘পুরনো সিন্ডিকেট’-এর তৎপরতা শুরু হয়েছে- এমন অভিযোগ উঠেছে নতুন ফেস-২ পানি সরবরাহ প্রকল্প ঘিরে। ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার এই প্রকল্প এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়ন পর্যায়ে পৌঁছেনি। অথচ ইতোমধ্যে টেন্ডার ও কমিটি গঠনে স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্টতা ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে সরগরম ওয়াসার ভেতর-বাহির। ওয়াসারই একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, আগের ফেস-১ প্রকল্পে যারা দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগে জড়িয়েছিলেন; তারাই আবার নতুন প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো দখলে নিয়েছেন। এখনই লুটপাটের প্রস্তুতি চলছে বলে আশঙ্কা অনেকের। তাই খুলনা ওয়াসা এখন আর প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান নয়। এটি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণাধীন একটি অর্থনৈতিক বলয় হয়ে গেছে। প্রকল্প যত বড়, সিন্ডিকেটের লাভও তত বেশি বলে মনে করছেন অনেকেই।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফেস-২ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫৯৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ঋণ হিসেবে ১ হাজার ৮২১ কোটি টাকা দিচ্ছে। আর ৭৭৬ কোটি টাকার অনুদান দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। গত ১৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। এই প্রকল্পের লক্ষ্য খুলনা শহরের আরও ২৬ হাজার নতুন গ্রাহককে নিরাপদ পানি সরবরাহ করা। তবে অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন সেই পুরনো বিতর্কিত কর্মকর্তারা। যাদের বিরুদ্ধে আগের ফেস-১ প্রকল্পে নানা অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল।

সিন্ডিকেটের দখল

ওয়াসার অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, আগের প্রকল্পে তথাকথিত ‘ওয়াসা সিন্ডিকেট’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন খুলনা মহানগরীর সাবেক মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক, ওয়াসার সাবেক চেয়ারম্যান কাজী আমিনুল হক, সাবেক কাউন্সিলর আনিসুর রহমান পপলু ও আমিনুল ইসলাম মুন্না। তারা নেপথ্যে আবারও সক্রিয় হয়েছেন। তাদের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা এখনও এই প্রকল্পের দায়িত্বে থেকে নতুন প্রকল্পের টেন্ডার, মূল্যায়ন ও প্রশাসনিক কমিটিগুলোর মূল পদে বসেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা হলেন বর্তমান উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) ঝুমুর বালা, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খান সেলিম আহমেদ, সচিব প্রশান্ত কুমার বিশ্বাস এবং নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম। খুলনা ওয়াসার একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারাই প্রকল্পের মূল নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে কাজ করছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়াসার একজন কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, দরপত্র উন্মুক্তকরণ থেকে শুরু করে মূল্যায়ন- সব জায়গাতেই একই মুখ। মানেÑ যারা টেন্ডার খুলবে, তারাই আবার মূল্যায়ন করবে। এতে লুকোচুরির সুযোগ থেকেই যাচ্ছে। দরপত্র উন্মুক্তকরণ কমিটির আহ্বায়ক ঝুমুর বালা, সাত সদস্যবিশিষ্ট মূল্যায়ন কমিটিতেও তিনিই আহ্বায়ক। একইভাবে খান সেলিম আহমেদ দুই কমিটিতেই রয়েছেন, আর রেজাউল ইসলাম আছেন সদস্য সচিব হিসেবে। একই ব্যক্তি একাধিক কমিটিতে থাকলে স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়াই স্বাভাবিক- এমন মন্তব্য করেছেন প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞরাও।

চায়না জিও আবারও আলোচনায়

ফেস-১ প্রকল্পে চায়না জিও ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন ছিল প্রধান ঠিকাদার। সেই প্রকল্পে কাজের মান, সময়সীমা না মানা এবং অতিরিক্ত বিল আদায়ের অভিযোগ ওঠে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে। এবারও এই কোম্পানিই ফেস-২ এর প্যাকেজ-১ এ দরপত্র জমা দিয়েছে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর চায়না জিওসহ আরও সাতটি কোম্পানি টেন্ডার সাবমিশন করে। তবে সবচেয়ে বড় প্যাকেজের জন্য চায়না জিও ইতোমধ্যে প্রস্তাব জমা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির কর্তারা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছেন। চায়না জিওর পেছনে আগের মতোই রয়েছে রাজনৈতিক ছায়া। কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি কোম্পানিটিকে সুবিধা পাইয়ে দিতে কাজ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে খুলনা ওয়াসার সচিব প্রশান্ত কুমার বিশ্বাস প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সবকিছুই এডিবির শর্ত অনুযায়ী হচ্ছে। কোনো অনিয়মের সুযোগ নেই। স্বচ্ছতা বজায় রেখে দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে।’ 

প্রথম প্রকল্পের ব্যর্থতা, অদৃশ্য দায়

২০১১ সালে শুরু হওয়া খুলনা ওয়াসার ফেস-১ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছিল ২ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা। লক্ষ্য ছিল শহরে নিরাপদ ও পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রকল্প শেষ হলেও খুলনাবাসীর অভিযোগ- পানির মান আগের চেয়েও খারাপ হয়েছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় পানি লবণাক্ত, রাস্তাঘাট ভেঙে পড়েছে, ড্রেনেজ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত। অনেক এলাকায় নলকূপ বন্ধ, অথচ বাড়িভাড়া বেড়েছে ওয়াসার বিল বৃদ্ধির কারণে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) খুলনার আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রথম প্রকল্পের অনিয়মের কোনো তদন্ত হয়নি। এখন আবার একই কর্মকর্তারা, একই প্রক্রিয়ায় নতুন প্রকল্প নিচ্ছেন। এতে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে।’

সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালের পর ১/১১ রাজনৈতিক পর্বে তালুকদার আব্দুল খালেক খুলনা সিটির মেয়র হন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর তিনি খুলনা ওয়াসার চেয়ারম্যান হন, যদিও পদটি ছিল অবৈতনিক। সে সময় থেকেই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে খুলনায় বহুল আলোচিত ‘শেখবাড়ি’ নামের রাজনৈতিক প্রভাবকেন্দ্রটি ওয়াসার নিয়োগ ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। সেই প্রভাব বলয়ের মধ্যে সবকিছু পরিচালিত হতো। এখনও নতুন প্রকল্পে সেই বলয় আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। 

অর্থনীতি বনাম পরিবেশ

খুলনা অঞ্চলে নদীর পানিতে উচ্চ লবণাক্ততা থাকায় পানি সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পাওয়া কঠিন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূগর্ভস্থ ও নদীর পানি মিশিয়ে পরিশোধনই হতে পারে টেকসই সমাধান। কিন্তু নতুন প্রকল্পে বিদেশি ঋণের অর্থে লবণ অপসারণ কেন্দ্র (ডিস্যালিনেশন প্লান্ট) বসানোর প্রস্তাবে ব্যয় বেড়ে যাবে ৮-১০ গুণ। বর্তমানে খুলনা ওয়াসা প্রতি হাজার লিটার পানি উৎপাদনে ব্যয় করছে প্রায় ২০ টাকা। নতুন ডিস্যালিনেশন ইউনিট চালু হলে এই ব্যয় দাঁড়াতে পারে ১৫০ থেকে ২০০ টাকায়, যা ওয়াসার পক্ষে টেকসই নয়। এতে সাধারণ গ্রাহকের ওপরও বাড়তি চাপ পড়বে এবং প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ‘সাশ্রয়ী নিরাপদ পানি’র বিপরীতে যাবে। ফেস-১ প্রকল্পের পর থেকেই খুলনা ওয়াসার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমেছে। অনেকেই মনে করেন, প্রকল্প মানে দুর্নীতি, নয় জনসেবা।

জবাবদিহি না থাকলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

খুলনা ওয়াসার ফেস-২ প্রকল্পের কাজ এখনও শুরু হয়নি। তবু অভিযোগের ছায়া ঘন হচ্ছে। নাগরিক সংগঠনগুলো বলছে, প্রকল্প শুরু হওয়ার আগেই যদি একই ব্যক্তিরা সব সিদ্ধান্তে থাকে, তাহলে আগের মতো ব্যর্থতা আবারও আসবে। খুলনার পানি সমস্যা প্রকল্পে নয়, নীতিতে। প্রকল্প যতই বড় হোক, দায়িত্বশীলতা না ফিরলে খুলনার জল সংকট আরও গভীর হবে। ফেস-১ প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ নিরপেক্ষ তদন্তের আগে নতুন কোনো বড় প্রকল্প নেওয়া উচিত নয় বলেও বিশেষজ্ঞদের অভিমত। অন্যথায় এই ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পও রূপ নেবে আরেকটি ব্যর্থতা ও দুর্নীতির নজিরে। খুলনাবাসীর মতে, খুলনা ওয়াসার নতুন ফেস-২ প্রকল্প নগরবাসীর জন্য আশার নয়, বরং আশঙ্কার নাম হয়ে উঠছে। যখন পুরনো অনিয়মের দায় এখনও নির্ধারণ হয়নি, তখন একই সিন্ডিকেটের হাতে নতুন প্রকল্প তুলে দেওয়ায় প্রশ্ন উঠছে- ওয়াসার উন্নয়ন কার জন্য, খুলনার মানুষের নাকি আরেকটি আর্থিক উৎসবের জন্য?

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা