× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বড় বেদনার মতো …

ইমতিয়ার শামীম

প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০২৫ ০০:৪৬ এএম

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৫ ০১:০১ এএম

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

এক শুক্রবারের বিকাল থেকে আরেক শুক্রবারের বিকাল- আমাদের চেনাজানা জগৎটাই কেমন পাল্টে গেল! আশঙ্কার কালো মেঘ জাপটে ধরেছিল প্রথম বিকালেই। তবে মাঝখানে আশার আলোও জ্বলেছিল লাইফ সাপোর্ট থেকে তিনি ফিরে এসেছেন বলে। কিন্তু পরবর্তী শুক্রবারের সকাল সেই শঙ্কাকে আবার ফিরিয়ে আনল আর বিকালটা আমাদের মুড়ে দিল চিরবিষণ্নতায়Ñ বড় ক্লান্ত ছিলেন, বড় বেশি ক্লান্ত ছিলেন তিনি পৃথিবীর এই রক্তপাতময় হল কোলাহলে। তাই চিরপ্রশান্তির আস্বাদ নিতে চিরঘুমে তলিয়ে গেলেন। আমরা হারালাম তাকে, কিন্তু যা পেয়েছি তা কি আর হারাতে পারে?

হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছতে মুছতে এইসব কথা লিখতে হয় আমাদের, এইসব কথা মনে পড়ে বলে হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছতে মুছতে দুর্বলতা-কাতরতা ঢাকি আমরাÑ সে বড় কঠিন সময় ছিল আমাদের, ভালো অনুবাদ হতো না, ভালো করে ইংরেজি বুঝতে পারতাম না, বিদেশ থেকে বইপত্তর আসার সুযোগসুবিধা ছিল না, ছিল না অন্তর্জালের জগৎ; কিন্তু ছিল ‘অলস দিনের হাওয়া’। বৃহস্পতিবার এলেই আমাদের চারপাশে বয়ে যেত ‘অলস দিনের হাওয়া’। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম লিখতেন দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সাময়িকীতে সেই কলাম। আলস্য বোধকরি ভীষণ প্রিয় ছিল তার, তাই লিখিয়ে হিসেবে সুপরিচিত হয়ে ওঠার ওই দিনগুলোতে তিনি তার ধারাবাহিক কলামটির নাম দিয়েছিলেন ‘অলস দিনের হাওয়া’। যদিও আমাদের গণ্ডিবদ্ধ মফস্বলি জীবনে, ভালো, বড় কোনো পাঠাগার না থাকা জীবনে সেই হাওয়া কী যে ঝড় তুলতÑ কুয়োর ব্যাঙ আমরা, আমাদের সেই কুয়োতে এসে আছড়ে পড়ত সমুদ্রের ঢেউ-কল্লোল। শিহরিত হয়েছিলাম ‘লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা’র মতো একটি বইয়ের কথা জেনে। কী যে তিনি দিয়েছেন আমাদের, কীভাবে যে আমাদের প্রস্তুত করেছেন ভবিষ্যতের জন্যে, তা কেবল আমরাই জানি। আর এ-ও জানি, আকাশের মতো খাতা আর সমুদ্রের মতো দোয়াত এনে দিলেও লিখে ফুটিয়ে তোলা যাবে না সেই পাওয়া। 

তার পরদিন গেছে, শুধু প্রধান সারির কথাসাহিত্যিক নন, বৃত্ত ভাঙতে ভাঙতে তিনি পরিণত হয়েছেন ধীমান প্রাজ্ঞ পথিকৃৎ ব্যক্তিত্বে। শিক্ষাজীবনে যার গবেষণার বিষয় ছিল কবিতায় ইমানুয়েল সুইডেনবার্গের দর্শনের প্রভাব, সেই মানুষটির চিন্তাচেতনা, দর্শন ও লেখালেখির অন্তর্গত বিষয়-আশয় ও প্রকরণই বর্তমানে হয়ে উঠেছে তরুণ গবেষক-চিন্তকদের আলোচনার বিষয়।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম নিজের অন্বিষ্ট ও অন্বেষণের উপসংহারে পৌঁছেছেন বাঙালি ও এ-জনপদের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মুক্তিসংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতার আবহে; শিক্ষাদীক্ষা ও সাহিত্যের কাছে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে জাগ্রত মানুষের প্রত্যাশার গূঢ়, অন্তর্লীন প্রেক্ষাপটে। বাঙালির দীর্ঘ অভিযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ও সাক্ষী তিনি। ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে প্রথম গল্প ‘বিশাল মৃত্যু’ প্রকাশের পর কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মন্তব্যে হতোদ্যম সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম গল্প লেখায় ‘আপাতত ক্ষান্তি’ দিয়েছিলেন। আমাদের সৌভাগ্য, পরে, ১৯৮৯ সালের দিকে, তিনি আবারও ফিরে আসেন গল্পের জগতে। ফলে বাংলা কথাসাহিত্য, বিশেষত ছোটগল্প, খুঁজে পেয়েছে বিস্ময়কর সব অবলোকনের স্রোত, বিচিত্র মানসজগতের প্রতিচিত্র ও মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের নিবিড় ধারাপাত। সাহিত্যচর্চার একপর্যায়ে তিনি স্থির হয়েছিলেন এই ধারণায় যে, কবিতার উপজীব্য যেমন শব্দ, তেমনি গল্প, উপন্যাস ও নাটকের প্রধান উপজীব্যই হলো ভাবনা। তার এ অবস্থানের সপক্ষে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ফিনেগানস ওয়েক-এর মতো শব্দপ্রধান উপন্যাসেও দেখা যাচ্ছে, সেখানে জয়েসের ভাবনাগুলো শব্দরূপ নিয়েছে মাত্র। সৈয়দ মনজুরুলের গল্প, উপন্যাসিকা কিংবা উপন্যাসেও প্রকাশ পেয়েছে এমন অবস্থান ও ধারণার। গল্প-উপন্যাসের কাহিনী, রেখাবিন্যাস, চরিত্রের নির্মাণ ও বিকাশ এবং ঘটনার পরম্পরা ও অভিঘাত সৃষ্টির ক্ষেত্রে তিনি যেভাবে এগিয়ে চলেন, তাতে শেষমেশ আমরা পৌঁছাই এমন এক সত্যে যা যেন কোনো এক অলীক পৃথিবীর পূর্বাপরতা, পৌঁছাই এমন এক মিথ্যার মতো সত্যে যার উপস্থিতিই জেগে থাকার ও নতুন করে জেগে ওঠার প্রেরণায় উদ্ভাসিত।

সাহিত্যচর্চা তো দীর্ঘ এক অভিযাত্রা। সেই অভিযাত্রার শুরুতে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে আমরা দেখেছি সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে শিল্পকলার সমালোচক হিসেবে আবির্ভূত ও বিকশিত হতে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের পর আপনাআপনিই চলে আসে তার নাম।

উপন্যাস খুব কম লিখেছেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, তার অবাধ বিচরণের ক্ষেত্র আসলে ছোটগল্পই। এই ক্ষেত্রে তার নিবিড় সাযুজ্য দেখি শক্তিমান কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের সঙ্গে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে লিখলেও হাসানের মতো তিনিও নিজের স্থানটিকে শক্তিশালী করেছেন মূলত ছোটগল্পের ওপর দাঁড়িয়ে। 

কিন্তু কোত্থেকে গল্পের জোগান পান সৈয়দ মনজুরুল? কীভাবে তিনি সাঁতরান আর কূল খুঁজে পান গল্পের নদী ও তরঙ্গে, যা তাকে শক্তিমান করে তুলেছে? এ নিয়ে নিজের গল্পসকল-এর ভূমিকায় তিনি সামান্য যে কয়েকটি বাক্য লিখেছেন, তার গভীরতা-অতলতা নিঃসন্দেহে প্রাসঙ্গিক ও অতুলনীয়। তিনি লিখেছেন, ‘আমি বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে, মফস্বল শহরে ঘুরেছি মানুষের জীবনের নানা গল্পের সন্ধানে, চোখ খোলা রেখেছি সেসব গল্পের পেছনের রঙগুলোকে চিনে নিতে এবং কান পেতে দিয়েছি তাদের ভাষার ধ্বনিময় অথবা নীরব অঞ্চলে যেখানে শব্দ-নৈঃশব্দ্যের দ্বৈরথে তৈরি হয় প্রতিদিনের আখ্যানগুলো। আমার গল্পের বিষয়ের জোগান দিয়েছে আমার অভিজ্ঞতা, আমাদের সংবাদপত্র, জানাশোনা মানুষজন, ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে আমার কথোপকথন। গল্প সবখানে আছে, এবং কোনো গল্পই হারিয়ে যায় না। এক মানুষের গল্প জায়গা নেয় অন্য মানুষের গল্পে, সমষ্টির স্মৃতিতে।’ এই কথাগুলোই তার গল্প পড়ার ও তা নিয়ে ভাবার দরজা খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট; যথেষ্ট তার গল্পের অন্তঃশিলায় প্রবহমান দর্শনকে খুঁজে নেওয়ার জন্য। 

ঈপ্সিত লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে, একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক হয়ে উঠতে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই যুক্ত হননি সৈয়দ মনজুরুল। সৃজনশীলতার সংগ্রামে নিমগ্ন এই মানুষটি এমন অনেক কিছুই উপেক্ষা করেছেন দৃঢ়তার সঙ্গে, যেসবের জন্য লালায়িত এই সময়ের বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবী-শিক্ষক-লেখক। শুধু বাংলা একাডেমি কিংবা শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব নেওয়ার নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কিংবা মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান হওয়ার প্রস্তাবও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন, নিমগ্ন থেকেছেন নিজের একটি ঘর, সৃষ্টিমুখর ঘর গড়ে তোলার কাজে।

নিমগ্নতার মধ্যেই নিজেকে গুটিয়ে নিলেন তিনি। তার সঙ্গে আমার নিজের কতটুকু স্মৃতি আছে, কতটুকু বোঝাপড়া আছে, সে কথা আজ থাক; আমাদের কথোপকথনটুকু আজ কেবল আমাদেরই থাক মনজুর ভাই। দেখুন, আশ্বিনের বৃষ্টি নামল আপনার চলে যাওয়ার শব্দ শুনে; আশ্বিনের বৃষ্টি চাইছে আপনার চলে যাওয়ার শব্দকে ঢেকে দিতে। কিন্তু পারছে না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার মধ্য থেকে আপনি তুলে নিয়েছিলেন আপনার কলামের নাম ‘অলস দিনের হাওয়া’। আমিও তার কাছ থেকেই ধার করে বলি, ‘বড় বেদনার মতো’ বেজে চলেছে আপনার চলে যাওয়া।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা