এহসানুল হক সুমন, রংপুর
প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:৪৮ এএম
রংপুরের পীরগাছার পারুল ইউনিয়নে আনন্দী ধানী এলাকায় অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত সিরাজুল। প্রবা ফটো
রংপুরে অ্যানথ্রাক্স আতঙ্ক চরমে পৌঁছেছে। গবাদিপশু থেকে ছড়িয়ে পড়া এই রোগে একের পর এক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন দুজন, আক্রান্ত হয়েছে শতাধিক। পশু মৃত্যুর পাশাপাশি চিকিৎসা না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়েছে রোগীরা। হাট-বাজারে অসুস্থ গরু বিক্রি অব্যাহত থাকলেও প্রশাসনের তৎপরতা নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, অ্যানথ্রাক্সের চিকিৎসায় প্রতিটি উপজেলায় পর্যাপ্ত ওষুধ মজুত রাখাসহ মাঠপর্যায়ে মেডিকেল টিম কাজ করছে।
পীরগাছা উপজেলার পূর্ব পারুল বানিয়াপাড়া এলাকায় সরেজমিন দেখা গেছে, স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম (৬৪) অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে পায়ের দগদগে ঘায়ের কষ্টে ভুগছেন। আলাপচারিতায় তিনি জানান, তার গোয়ালের চারটি দেশীয় জাতের গরুর মধ্যে গত মাসে হঠাৎ দুটি গরুর জ্বর হওয়ায় স্থানীয় ভেটেরিনারি চিকিৎসক টিকা দিয়েও গরু দুটিকে বাঁচাতে পারেননি। পরে অন্য দুটির মাংস বিক্রি করা হলে তা খেয়ে তিনি ও তার স্ত্রী আক্রান্ত হন। ক্ষতস্থানে প্রচুর চুলকানি, ব্যথাসহ জ্বরে পড়েন তারা। স্ত্রী কিছুটা সুস্থ হলেও সিরাজুল ইসলামের অবস্থার উন্নতি হয়নি।
তিনি বলেন, ‘মোর ভাইগ্নার একটা গরু মারা গেইচে। মোর ভাবি এই রোগ মরছে। নাতিরাও অসুস্থ। মোর পায়ের ঘাও এলাও শুকায় নাই। ডাক্তাররা আসি দেখি গেইচে, আর কোনো খোঁজ রাখে নাই। ওষুধ, টাকা-পাইস্যা দেওয়া তো দূরের কতা। হামরা গরিব মানুষ, কেমন করি চিকিৎসা করমো, আর কী খামো।’
স্থানীয় মুয়াজ্জিন মোসলেম উদ্দিন জানান, তিনি নিজেই একটি অসুস্থ গরু জবাই করে তার মাংস খেয়ে আক্রান্ত হয়েছেন। তার পিঠে ফুসকুড়ি উঠে বড় ঘায়ে পরিণত হয়েছে। স্ত্রীকেও অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত অবস্থায় চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
একই এলাকার জয়নাল মিয়া বলেন, ‘স্ত্রী কমলা বেগম অসুস্থ গরুর মাংস কাটাকাটি ও রান্নার সময় আক্রান্ত হন এবং পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।’
পীরগাছা দেউতি আইডিয়াল স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাশেদুল ইসলাম বলেন, এটি এখন প্রায় মহামারির রূপ নিচ্ছে। শত শত গবাদিপশু মারা যাচ্ছে, কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের কোনো কার্যকর তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। শুধু নমুনা সংগ্রহ করে দায়িত্ব শেষ করেছে তারা। এ ছাড়া বাজারে অবাধে অসুস্থ গরু-ছাগলের মাংস বিক্রি হলেও প্রশাসনের কোনো নজরদারি নেই, আমরা আতঙ্কিত।
রংপুর জেলা সিভিল সার্জন সূত্রে জানা যায়, গত ৬ অক্টোবর পর্যন্ত রংপুর জেলার পীরগাছা, কাউনিয়া ও মিঠাপুকুর উপজেলায় অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ থাকা ৫৩ জনের মধ্যে ২১ জনের নমুনা আইইডিসিআরে পাঠানো হলে ১১ জনের অ্যানথ্রাক্স নিশ্চিত হয়েছে। বাকিরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন। রংপুরে ছড়িয়ে পড়া অ্যানথ্রাক্সটি কিউটিনিয়াস অ্যানথ্রাক্স। এটি মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না বলে মারাত্মক নয় দাবি স্বাস্থ্য বিভাগের।
রংপুর সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা জানান, অ্যানথ্রাক্স পশু থেকে ছড়ায়, মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। কেউ যদি আক্রান্ত গরু, ছাগলের মাংস কাটাকাটি করে কিংবা অসুস্থ পশুর সংস্পর্শে আসে, তাহলে তিনি আক্রান্ত হন। এটি চিকিৎসাযোগ্য রোগ, অ্যান্টিবায়োটিক সেবনেই ভালো হয়ে যায়। প্রতিটি উপজেলায় পর্যাপ্ত ওষুধ মজুত রয়েছে এবং মেডিকেল টিম মাঠে কাজ করছে। অসুস্থ পশু জবাই বন্ধে গৃহীত পদক্ষেপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্যানিটারি ইন্সপেক্টর ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে বাজারে নজরদারি চলছে। এ ছাড়া আক্রান্তদের বাড়িতে গিয়েও ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় প্রায় ৯৫ লাখ গরু ও ৯০ লাখ ছাগল রয়েছে। বিভাগের প্রাণিসম্পদ পরিচালক ডা. আব্দুল হাই সরকার জানান, রংপুর জেলায় ১ লাখ ৭০ হাজার এবং পীরগাছায় ৫৩ হাজার গরু-ছাগলকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। ভ্যাকসিনের ঘাটতি পূরণে চাহিদা পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সচেতনতা প্রচারও চলছে।
উল্লেখ্য, চলতি বছর আগস্টের শুরুতে রংপুরের পীরগাছা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। সেপ্টেম্বরে আনন্দী ধনীরাম গ্রামের কমলা বেগম এবং মাইটাল এলাকার আব্দুর রাজ্জাক অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।