শাখাওয়াত হোসেন সোহান, রাজবাড়ী
প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০২৫ ১১:০৩ এএম
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ার ৭ নম্বর ফেরিঘাট এলাকা থেকে সোমবার ছবিটি তোলা। প্রবা ফটো
ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষা করে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য গত শনিবার থেকে শুরু হয়েছে ইলিশ মাছ ধরায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে পদ্মা ও যমুনা নদীর মোহনাসহ পদ্মা পাড়ের বিভিন্ন স্থানে নিষেধাজ্ঞাকালীন ইলিশ শিকারের ব্যাপক আয়োজন চলছে।
জানা গেছে, বছরের অন্য সময়ের চেয়ে পদ্মা নদীতে নিষেধাজ্ঞার সময়ে বেশি ইলিশ ধরা পড়া এবং এ সময়ে পদ্মা নদীতে বিচরণ করা মা ইলিশগুলো পরবর্তী সময়ে এই এলাকায় না থাকার যুক্তি তুলে ধরে থাকেন পেশাদার ছাড়াও অসংখ্য মৌসুমী জেলে।
প্রশাসনের অভিযান পাশ কাটিয়ে গত বছরে বিপুল পরিমাণ মা ইলিশ শিকার করেছে জেলেরা। এবারও তারই ধারাবহিকতায় জেলেরা ইলিশ শিকারের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়রা বলেন, ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় ৪ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে ২২ দিন ইলিশ মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর।
এ সময় নদীতে মাছ ধরা, মজুদ করা, পরিবহন করা, বাজারজাতসহ সব ধরনের বেচা-কেনা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেছে সরকার। ২২ দিনের এ সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রাজবাড়ী গোয়ালন্দ উপজেলার পদ্মা পাড়ের বিভিন্ন পয়েন্টে মা ইলিশ শিকারের নানা আয়োজন চলছে। সেপ্টেম্বরের শেষের দিক থেকে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহেই ইলিশ মাছ ধরার জন্য জেলেরা জাল-নৌকা মেরামত ও পর্যাপ্ত সরঞ্জাম প্রস্তুত করেছেন।
নাম প্রকাশ না কারার শর্তে একাধিক জেলে বলেন, বছরের অন্যান্য সময় পদ্মা নদীর এই এলাকায় তেমন একটা ইলিশের দেখা পাওয়া যায় না। কারণ ইলিশ মাছ সাগর থেকে নদীতে আসার পর ভাটি অঞ্চলগুলোয় যেমনÑ বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলার জেলেরা বৈধ-অবৈধ নানা ধরনের জাল ব্যবহার করে ইলিশ মাছ শিকার করেন।
এতে ইলিশ মাছ এ এলাকায় পৌঁছানোর আগেই ওই অঞ্চলে মারা পড়ে। ফলে এখানকার জেলেরা খুব একটা ইলিশের দেখা পায় না। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার সময়ে বিভিন্ন স্থানে অভিযানের কারণে বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে পদ্মা নদীর গোয়ালন্দ পয়েন্টে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ে। আর ওই ইলিশের লোভে এই এলাকার জেলেরা এ সময় ইলিশ শিকারের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে।
সোমবার (৬ অক্টোবর) দুপুরে সরেজমিন গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের সাত্তার মেম্বার পাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই চলছে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও জেলে নৌকা মেরামতের কাজ। তারা বলেন, আকারভেদে প্রতি সেট কারেন্ট জাল তৈরিতে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ পড়ে। অভিযানে জাল জব্দ ও জেল জরিমানার কথা বললে তারা বলেন, ‘একদিন মাছ ধরতে পারলে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার মাছ ধরা যায়। এতে জালের খরচ উঠে আসে। এর আগেও আমরা একাধিকবার ১০-১৫ দিন করে জেল খেটেছি।’ এ সময় কেউ কেউ বলেন, তারা শুধু নিষেধাজ্ঞার সময় মাছ ধরেন। কারণ এ সময়ই নদীতে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যায়; যা অন্য সময় পাওয়া যায় না।
শামিম হালদার নামের এক জেলে বলেন, ২২ দিন নদীতে মাছ ধরা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। এ ২২ দিন আমরা কী খাব? এ নিয়ে চিন্তায় আছি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিগত বছরগুলোয় নিষেধাজ্ঞাকালীন শিকার করা ইলিশ স্থানীয় আড়ত অথবা বাজারে বিক্রি করতে না পারলেও পদ্মা পাড়ের দুর্গম কলাবাগান এলাকায় মা ইলিশ বেচা-কেনার অস্থায়ী বাজার বসানো হয়েছিল। দুর্গম পথ এবং ওই বাজার জমজমাট হয়ে ওঠে। ওই বাজারের বিরুদ্ধে প্রশাসনের ব্যাপক প্রস্তুতি ছাড়া সচারাচর অভিযান চালানোও সম্ভব হয়নি। এ বাজার ছাড়াও পদ্মা পাড়ের বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে বিক্রি করা হয়েছিল মা ইলিশ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গোয়ালন্দ উপজেলার ছোট ভাকলা ইউনিয়নের অন্তার মোড় থেকে শুরু করে দেবগ্রাম, দৌলতদিয়া ও উজানচর ইউনিয়নের পদ্মা পাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে শত শত নৌকা প্রস্তুত রাখা হয়েছে মা ইলিশ শিকারের জন্য। প্রত্যেক জেলে দল একাধিক নৌকা-জাল বিকল্প হিসেবে প্রস্তুত করে রাখছেন। অভিযানের সময় নৌকা জাল ধরা পড়লে তারা যেন বিকল্প জাল নিয়ে ইলিশ শিকারে নামতে পারেন।
জেলেদের অভিযোগ, বিকল্প কর্মসংস্থান বা পর্যাপ্ত সহায়তা না থাকায় তারা বাধ্য হচ্ছেন মাছ শিকারে নামতে। সরকারের পক্ষ থেকে ভিজিএফের চাল বরাদ্দ থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে দাবি তাদের।
দৌলতদিয়া নৌপুলিশ ফাঁড়ির ওসি ত্রীনাথ সাহা বলেন, ইলিশ রক্ষায় নৌপুলিশের ফরিদপুর জোনের এসপির নেতৃত্বে নদীতে অভিযান ও পাটুরিয়া ঘাট এলাকায় সচেতনতামূলক সভা করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসন, কোস্ট গার্ড, নৌপুলিশসহ টাস্কফোর্স মাঠে কঠোর অবস্থানে থাকবে।