শেখ সিরাজুল ইসলাম, সরাইল (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০২৫ ১০:০৬ এএম
আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৫ ১০:৩০ এএম
বছরের বেশিরভাগ সময় পানিবেষ্টিত থাকে ক্ষমতাপুর গ্রাম। প্রবা ফটো
তিতাস নদীর শাখা বয়ে চলছে গ্রামটির পাশ ঘেঁষে। একদিকে নদী, অন্যদিকে বিল-হাওর। নদীর বাঁকে বাঁকে গ্রামটির অবস্থান। দেখতে ধনুকের মতো বাঁকা, নয়নাভিরাম ছবির মতো। শুস্ক মৌসুমে সবুজ-শ্যামল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। তবে ভৌগোলিকভাবে গ্রামটি বছরের বেশিরভাগ সময় পানিবেষ্টিত থাকে। সারা বছর যোগাযোগে নৌকাই গ্রামটির বাসিন্দাদের একমাত্র ভরসা। বলছি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের গ্রাম ক্ষমতাপুরের কথা।
গ্রামটিতে আগে অনেক পরিবার বসবার করলেও যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকাসহ নানা প্রতিকূলতার কারণে দিন দিন পরিবারের সংখ্যা কমে আসছে। বর্তমানে গ্রামটিতে ২০০ পরিবার বসবাস করছে। যোগাযোগের জন্য একটি সেতুর দাবি যুগ যুগ ধরে করে আসছেন এই গ্রামের বাসিন্দারা। তবে নেওয়া হয়নি কোনও পদক্ষেপ। বাধ্য হয়ে একজন-দুজন করে গ্রাম ছাড়ছেন অনেকেই।
শাপলা বিলসহ এই বিশাল হাওরের হাজার হাজার একর জমির ফসল পরিবহনে যুগ যুগ ধরে সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের। কাঁধে করে, নৌকায় তুলে ঘরে তুলতে হয় হাওরের ফসল। সেতু নির্মাণ হলে যুগ যুগ ধরে সীমাহীন ভোগান্তির অবসান হবে, হাসি ফুটবে কৃষকের মুখে। এছাড়াও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাময় বাঁকে প্রতিদিন ঘুরতে আসা প্রকৃতিপ্রেমি মানুষদের যাতায়াতের সুবিধাও হবে। নদীর দক্ষিণ পাড়ে সরাইল উপজেলার একমাত্র বাণিজ্যিক ভাবে চাষাবাদকৃত তিতাস এগ্রো ফার্মের ড্রাগন বাগান, কাসিমখার বাজার (বুড্ডাঘাট), মৎস্য আড়ৎসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
এছাড়াও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ককের শাহবাজপুর প্রথম গেট এলাকা থেকে উত্তর দিকে শাহবাজপুর-বুড্ডা সড়ক ও সরাইল-নাসিরনগর-লাখাই আঞ্চলিক সড়কের পূর্ব দিকে কালীকচ্ছ-আখিতারা-বুড্ডা সড়ক দুটি মিলেছে তিতাসনদীর বুড্ডা ঘাট এলাকায়।
ক্ষমতাপুর গ্রামবাসী, কুচনী, বুড্ডা, শাহবাজপুর, আঁখিতারা, নোঁয়াগাওসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের শাপলা বিলে যাতায়াতের সুবিধার্থে দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত সেতুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন কতদূর কেউ জানেনা। তবু যুগ যুগ আশায় বুক বেঁধে আছে এখানকার বাসিন্দারা।
ক্ষমতাপুর ছেড়ে পাশের বুড্ডাগ্রামে বসতিগড়া বেশকয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা যোগাযোগ ব্যবস্থা, নদীর ভাঙনসহ বিভিন্ন প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়ে গ্রাম ছাড়লেও গ্রামটির মায়া ছাড়তে পারেনি।
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা সফিউল্লাহ মিয়া, ছান্দু মিয়া, আবদুল জলিল, আলেকশাহ মিয়া জানিয়েছেন, ১৫০ বছরের অধিক সময় আগে আমাদের পূর্বপুরুষেরা শাহবাজপুর মোড়াহাটি ও নিয়ামতউল্লাহ পাড়া থেকে এসে মৎস্য আহরণ ও কৃষিকাজের সুবিধার্থে প্রথমে অস্থায়ীভাবে বাথান ঘর, ধানের খলা ও পরবর্তীতে স্থায়ী বসতি গড়েন। বেশ কয়েকটি পরিবার বুড্ডা গ্রামে চলে যাওয়ার পর বর্তমানে গ্রামটিতে প্রায় ২০০ পরিবার বসত করে। গ্রামে একমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ শেষে অনেক শিক্ষার্থী দুর্গম যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে শিক্ষা জীবন থেকে ঝড়ে পড়ে।
তারা আরও জানিয়েছেন, কৃষিপ্রধান গ্রাম হলেও মৎস্য খাতে আমাদের প্রচুর অর্থ আয় হয়। প্রতিটি পরিবার বর্ষাকালে গড়ে দৈনিক ২/৩ হাজার টাকার মাছ বিক্রি করে। নৌকাও আমাদের আয়ের হাতিয়ার। মাছ ও ধানে ভরা এই সবুজে সবুজে ঘেরা সুখের স্বপ্ন ফেলে গ্রাম ছেড়ে যেতে মন চাই না। শুধু দরকার একটি বেড়িবাঁধ, নদীর উপর একটি সেতু।
এ বিষয়ে শাহবাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. আরিজ মিয়া ও নোঁয়াগাও ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের (বুড্ডা-কুচনী) সদস্য মো. অলি আহাদ মৃধা বলেন, গ্রামটি ভাঙন থেকে রক্ষার জন্য বেড়িবাঁধ ও যাতায়াত সুবিধার জন্য তিতাসনদীর ওপর সেতু নির্মাণ জরুরি।
শাহবাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মো. মুনির হোসেন ভুঁইয়া বলেন, নদী ও হাওরবেষ্টিত ক্ষমতাপুর গ্রামটি ভৌগোলিকভাবে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। গ্রামটির বাসিন্দাদের চলাচলের সুবিধার্থে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ মোহাম্মদ শামীম জানিয়েছেন, বুড্ডা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ ও ক্ষমতাপুর গ্রামে বেড়িবাঁধ জরুরি। সেতুর জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করেছি।
উপজেলা এলজিইডির উপসহকারি প্রকৌশলী আবদুর রহিম বলেন, তিতাসনদীর ওপর সেতু নির্মাণে অনুর্ধ্ব ১০০ মিটার ব্রিজ প্রকল্পের আওতায় প্রস্তাবনা দাখিল করা হয়েছে।