মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প
ফুয়াদ মোহাম্মদ সবুজ, মহেশখালী (কক্সবাজার)
প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:২৬ পিএম
ফাইল ফটো
কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পে পেন্টাওশান কোম্পানির কতিপয় কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করে গড়ে তুলেছেন প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। চাকরির আড়ালে ঠিকাদারি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে এই চক্র। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান কার্যালয়ে প্রদত্ত প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এবং নিবিড় অনুসন্ধানে এই সিন্ডিকেটের কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে। স্থানীয় ঠিকাদার ও ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকরা বলছেন, এই চক্রের কারণে তারা প্রকল্পের কাজ পাওয়া থেকে বঞ্চিত।
প্রকাশ, রাষ্ট্রের পক্ষে দায়িত্বে থাকা ৬ কর্মকর্তা আওয়ামী লীগের প্রভাবকে পুঁজি করে প্রকল্পে দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। জনৈক আনিছের নেতৃত্বে কোটি টাকা লুটপাট করেন তারা। অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও পূর্বেকার সময় রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ঘটনাগুলো ধামাচাপা পড়ে যায়। পরে সুযোগ বুঝে ফের একই কৌশলে দুর্নীতির কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হন তারা। এতে প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে স্থানীয়দের কাছে।
চাকরির পাশাপাশি অভিযুক্তরা নিজেদের আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের নামে একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের কাজ নিজেদের দখলে নিয়ে আসছেন তারা। ফলে সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এই প্রকল্পে অংশ নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা।
দুর্নীতির কার্যক্রম আড়াল করতে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা নতুন কৌশলও নিয়েছেন। মাতারবাড়ীর মগডেইল এলাকার বাসিন্দা আনছার নামে পেন্টাওশান লিমিটেডে কর্মরত এক ব্যক্তির মাধ্যমে বহিরাগত লোক নিয়োগ ও ঠিকাদারি ব্যবসার সমন্বয়ের কাজ পরিচালনা করছেন তারা। আনছারকে ব্যবহার করে নিজেদের সরাসরি সম্পৃক্ততা গোপন রাখছেন। এতে প্রকল্প এলাকায় বহিরাগত প্রভাব বাড়ছে, স্থানীয়দের সুযোগ কমছে এবং দুর্নীতির জাল আরও গভীর হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কোয়ান্টিটি অফিসার আনিছ নিজের ঘনিষ্ঠজনের নামে ‘সততা এন্টারপ্রাইজ’সহ একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। প্রকল্পের অবকাঠামো ও সাপ্লাইয়ের নানা ধরনের কাজ তারা নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে পাচ্ছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, আনিছের নেতৃত্বে এই সিন্ডিকেট বিভিন্ন ধাপে ব্যবসা করে কয়েক কোটি টাকা অবৈধভাবে আয় করেছেন। দুদকে জমা অভিযোগেও এসব অনৈতিক লেনদেনের বিশদ বিবরণ যুক্ত করা হয়েছে।
সরবরাহ খাতেও এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিম্নমানের কাঁচামাল ও খাদ্যপণ্য সরবরাহে আনিছ বদরখালীর বাসিন্দা ইলিয়াছকে ব্যবহার করছেন। পেন্টাওশানের কোয়ার্টার গার্ড হিসেবে থাকা ইলিয়াছের মাধ্যমে সিন্ডিকেটটি প্রকল্পের বিভিন্ন মালামাল সরবরাহ করছে। এসব সরবরাহে মান যাচাইয়ের নিয়ম উপেক্ষা করায় প্রকল্পের কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ ছাড়া অবকাঠামো নির্মাণে সাব-ঠিকাদার নিয়োগের ক্ষেত্রেও নিজেদের লোকজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগপত্রে উল্লেখ আছে, প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপের কাজ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে বাইরের উদ্যোক্তা ও ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের জন্য সুযোগ সীমিত করে দিয়েছে সিন্ডিকেট। এতে স্থানীয়দের ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। একাধিক স্থানীয় ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, প্রকল্পের কাজ পেতে প্রভাবশালী চক্রের মুখাপেক্ষী থাকতে হচ্ছে সবাইকে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, সিন্ডিকেট পদ্ধতিগতভাবে কমিশন, সরবরাহ ও ঠিকাদারি খাত থেকে কোটি টাকার লেনদেন করছে। নিজেদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ বাগিয়ে নিয়ে এ অর্থ বণ্টন করা হচ্ছে। এতে সরকারি তহবিলের অপব্যবহারের পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নেও গতি কমে যাচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসনিক তদারকি না থাকায় এই চক্র দিন দিন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
অভিযোগের বিষয়ে কোয়ান্টিটি অফিসার মোহাম্মদ আনিছ বলেন, অভিযোগ সত্য নয়। অডিট কর্মকর্তা আব্দুল কুদ্দুস সুজন বলেন, অভিযোগ করলে আমি দোষ স্বীকার করব না, আমাদের পরিচালনাকারীদের সঙ্গে কথা বলুন। তাদের বক্তব্যে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তদন্ত ও ব্যবস্থা না নেওয়াই এই চক্রের মূল শক্তি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী, জমির মালিক ও প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রকল্পে এমন সিন্ডিকেট বাণিজ্য সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য বড় বাধা। তারা অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে দ্রুত তদন্ত, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক তদারকি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ না নিলে এই সিন্ডিকেট আরও বিস্তৃত হয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।