রোবটিক্স প্রতিযোগিতা
রেজাউল করিম লিটন, চুয়াডাঙ্গা
প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৫ ১০:৪৮ এএম
নিজের উদ্ভাবিত হেক্সাগার্ড রোভারের পাশে জাহিদ হাসান জিহাদ। প্রবা ফটো
ছোটবেলা থেকেই রোবটিক্সের প্রতি কৌতূহল। সেই কৌতূহল থেকেই উদ্ভাবন। যা বিশ্বদরবারে শ্রেষ্ঠদের কাতারে নিয়ে গেছে চুয়াডাঙ্গার দর্শনার তরুণ উদ্ভাবক জাহিদ হাসান জিহাদকে। নিজের স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন তিনি।
সম্প্রতি মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইনোভেশন কমপিটিশন অ্যান্ড এক্সিবিশন (ওয়াইস) ২০২৫-এ শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি হিসেবে স্বর্ণপদক অর্জন করেছে জিহাদের উদ্ভাবিত রোবট ‘হেক্সাগার্ড রোভার’।
চার দিনব্যাপী এই বৈশ্বিক আয়োজনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের দুই শতাধিক দল অংশ নেয়। প্রতিযোগিতার আইটি ও রোবটিক্স ক্যাটাগরিতে বিচারকদের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে জিহাদের রোভারটি।
জিহাদের তৈরি ‘হেক্সাগার্ড রোভার’ একটি বহুমুখী সমাধান নিয়ে এসেছে। রোবটটি মূলত তৈরি হয়েছে জরুরি পরিস্থিতি, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং সামরিক নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে।
জিহাদ জানান, অগ্নিকাণ্ডে উদ্ধার থেকে সামরিক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এই রোভার। এর রয়েছে ১৩০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপ সহ্য করার ক্ষমতা ও স্টেইনলেস স্টিল বডি। ধোঁয়া ভেদকারী ক্যামেরা ও গ্যাস সেন্সর যুক্ত থাকায় এটি ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা যেখানে পৌঁছতে অক্ষম, সেখানে প্রাথমিক পর্যায়ে আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
তিনি জানান, ৬-ডিওএফ মেকানিক্যাল আর্ম, মেটাল ডিটেকশন এবং সিগন্যাল জ্যামিং সিস্টেমের মাধ্যমে বিপজ্জনক বিস্ফোরক শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করতেও এটি সক্ষম। সীমান্ত নজরদারিতে নাইট ভিশন ক্যামেরা, সেন্সর ও লাইভ ট্র্যাকিং সিস্টেম ব্যবহার করে সীমান্ত ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরবচ্ছিন্ন নজরদারিও করতে পারে এটি।
এ ছাড়া শিল্প কারখানায় বিষাক্ত গ্যাস শনাক্ত করা, বন্যপ্রাণী নিয়ন্ত্রণ করা এবং যুদ্ধ বা দুর্যোগ এলাকায় খাদ্য ও ওষুধ পৌঁছে দিয়ে ভয়েস কমিউনিকেশনের মাধ্যমে মানুষকে আশ্বস্ত করার মতো মানবিক কাজও করবে এই রোবট।
জাহিদ হাসান জিহাদ দর্শনা সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র এবং চুয়াডাঙ্গা সায়েন্স অ্যান্ড রোবটিক্স ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা।
জাহিদ হাসান জিহাদ প্রায় এক বছর ধরে চুয়াডাঙ্গা সায়েন্স অ্যান্ড রোবটিক্স ক্লাবে নিরলস পরিশ্রম করে এই রোভার তৈরি করেছেন। এই উদ্ভাবনী কাজে তাকে সহযোগিতা করেছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তোহা বিন আসাদ দীপ।
ক্লাবের সভাপতি শরিফুল আলম মিল্টন জানান, ‘খুলনা বিভাগ থেকে প্রথমবারের মতো এই বিশ্ব প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েই আমরা স্বর্ণপদক পেলাম। এটি জিহাদের উপস্থাপনা ও রোবটটির আধুনিক প্রযুক্তির ফল।’
জিহাদের এই আন্তর্জাতিক সাফল্য রাতারাতি আসেনি। এর আগে তিনি ৪৬তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে প্রথম স্থান অর্জন, ওয়াইস বাংলাদেশ রাউন্ডে সিলভার মেডেল এবং মর্যাদাপূর্ণ ড্রিমস অব বাংলাদেশ স্পেশাল অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। তার উদ্ভাবিত ‘ট্রেন সিকিউরিটি সিস্টেম’ গত বছর জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।
পরিবারের সদস্যরা বলছেন, ছোটবেলা থেকেই রোবটিক্সের প্রতি কৌতূহল ছিল জিহাদের। বহু বাধা পেরিয়ে সে তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসন এই অর্জনে উচ্ছ্বসিত। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘জিহাদের এই অর্জনে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল হয়েছে। আমরা তার সর্বাত্মক সাফল্য কামনা করি।’
দামুড়হুদা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে এইচ তাসফিকুর রহমান জিহাদকে ‘রত্ন’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘তার এই উদ্ভাবনী প্রকল্প দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে। জিহাদ নিঃসন্দেহে নতুন প্রজন্মের কাছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাওয়ার এক বিশাল অনুপ্রেরণা।’