কক্সবাজার সৈকতের বালিয়াড়ি
নুপা আলম, কক্সবাজার
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:২০ পিএম
প্রবা ফটো
১৯৯৯ সালে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার দূরত্বের সমুদ্রসৈকতকে ইসি বা পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে সরকার। সেই আইন অনুযায়ী, সৈকতের জোয়ার-ভাটার অঞ্চল থেকে ৩০০ মিটার পর্যন্ত যেকোনো স্থাপনা নির্মাণ ও উন্নয়ন নিষিদ্ধ। কিন্তু এ আইন কেউ মানছেন না। এ ছাড়া এ আইন অনুযায়ী উচ্চ আদালত ২০১১ সালে সৈকতের বালিয়াড়িতে সকল স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দেয়। সেই নির্দেশের আলোকে ২০২২ সালে প্রায়ই ৫ শতাধিক স্থাপনা উচ্ছেদ করে প্রশাসন। তবে থেকে যায় তিন শতাধিক স্থাপনা। এদিকে এরই মধ্যে নতুন চুক্তি করে সৈকতে স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দিয়েছে জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেল।ফলে সৈকতের বালিয়াড়ি দখল ও স্থাপনা নির্মাণের হিড়িক পড়েছে।
সম্প্রতি সৈকতের কলাতলী ও সুগন্ধা পয়েন্টে রাতারাতি শতাধিক দোকান তৈরি হয়েছে। বলা হচ্ছে, কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে বসানো হচ্ছে এসব দোকান।
এ বিষয়ে বালিয়াড়ির দোকানদার মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, একটি খাবারের দোকানের জন্য জেলা প্রশাসনের বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির ব্যাংক একাউন্টে ১৫ হাজার এবং জেলা প্রশাসনের এলআর ফান্ডের একাউন্টে ১৫ হাজার টাকা জমা দিয়ে ব্যাংক স্লিপসহ পর্যটন সেল জমা দিতে হয়। তবে অন্য একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রক্রিয়া মতো কার্ড পাওয়া যায় না। বছরের পর বছর আপনি বালিয়াড়িতে ব্যবসা করতে পারবেন কার্ড ভাড়া নিয়ে। কিন্তু আপনি যদি কার্ড নিজের নামে চান তবে এই ত্রিশ হাজার টাকার সঙ্গে কমে আরও এক লাখ টাকা গুনতে হবে আপনাকে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, এবারের যেসব কার্ড নতুন করে অনুমোদন দেওয়া রয়েছে, তাদের অধিকাংশ জামায়াত-বিএনপির নেতা, সমন্বয়ক, জাতীয় পত্রিকা ও বেসরকারি টেলিভিশনের সাংবাদিকসহ প্রভাবশালী মহল। জেলা প্রশাসনের বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি ও বালিয়াড়ি ভাড়া নেওয়া দোকানদারদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, লাবনী পয়েন্ট থেকে কলাতলী মোড় পর্যন্ত দূরত্ব ১ কিমি। ৩০০ মিটারের কম প্রস্থের এই দূরত্বের বালিয়াড়িতে আগে থেকেই ৮৩০টি দোকান রয়েছে। এই স্বল্প জায়গাতে গেল মাসের শেষ ভাগে নতুন করে আরও ৪ শতাধিক দোকান ও ৬ শতাধিক ছাতা চেয়ার বসানোর অনুমতি দিয়েছে জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেল। এরই প্রেক্ষিতে ২৩ সেপ্টেম্বর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় থেকে সৈকতে বসানো অবৈধ দোকানপাট ও স্থাপনা উচ্ছেদ করতে জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এদিকে সমুদ্রসৈকতের ইসিএ এলাকা দখলমুক্ত করতে দুই সচিবসহ সরকারি আটজন কর্মকর্তাকে আইনি নোটিস পাঠিয়েছে পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। তবুও উচ্ছেদ হয়নি স্থাপনা। আরও স্থাপনা অনুমোদন দেওয়ার পাঁয়তারা করছে প্রশাসন।
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজার (টুয়াক) আহ্বায়ক মিজানুর রহমান মিল্কী বলেন, সরকার এ এলাকাকে ইসিএ এলাকা ঘোষণা করেছে এবং হাইকোর্ট থেকেও বালিয়াড়ি দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে স্থানীয় জেলা প্রশাসন উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনার বদলে আরও দোকান বসানোর অনুমতিপত্র দিচ্ছে, যা হাইকোর্টের নির্দেশনার লঙ্ঘন। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন শাখার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আজিম খান বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মেনেই সব করা হয়েছে। যদি আমরা অনুমতি না দিতাম তবুও সেখানে লোকজন বসত। দখল হতো। নতুন করে যে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তা নয়। ২০০২ সাল থেকে এটি চলমান।
পুরাতন দোকানের পাশাপাশি এত নতুন দোকান অনুমতি দেওয়ার ব্যাপারে বলেন, পুরাতন সবার কার্ড নবায়ন করা হয়নি। কাজেই হিসাব করলে দোকানের তেমন তারতম্য হবে না। তবে আগের তুলনায় কিছুটা বাড়বে।
সৈকতের বালিয়াড়িতে দোকানপাট বসানোর সুযোগ নেই জানিয়ে বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য সচিব রায়হান উদ্দিন বলেন, বালিয়াড়ি থেকে সমস্ত স্থাপনা সরিয়ে নেওয়া হবে- এটা নিশ্চিত থাকেন। তাদেরকে কার্ড বরাদ্দ দেওয়ার পর জায়গা দেখিয়ে দেওয়ার আগেই তারা নিজেদের মর্জিমাফিক বালিয়াড়িতে বসে গেছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশের কক্সবাজারের ডিআইজি আপেল মাহমুদ বলেন, জেলা প্রশাসন কার্ড দিয়েছে লাবনী, সুগন্ধা, কলাতলী বিচ লিখে। যেটা কোনো অবস্থাতেই তারা পারে না। আর তাদের সেই অনুমোদন পরিবেশ মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন দিয়ে বাতিল করেছে। তিনি বলেন, পরিবেশের ভারসাম্যের স্বার্থে বালিয়াড়িতে কোনো স্থাপনা থাকবে না। যদি জেলা প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা না নেয় তবে পুলিশ উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে বালিয়াড়িকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনবে।