অনাথ মন্ডল, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা)
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৫ ১০:৪৯ এএম
বনায়নের গাছ কেটে সাবাড় করে ফেলছে দুর্বৃত্তরা। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের দ্বীপবেষ্টিত খোলাপেটুয়া নদীর চর। শুক্রবার তোলা। প্রবা ফটো
সাতক্ষীরার শ্যামনগরের দ্বীপবেষ্টিত পদ্মপুকুর ও গাবুরা ইউনিয়নের সংযোগস্থল চৌদ্দরশি ব্রিজের পশ্চিমে খোলপেটুয়া নদীর চরে গড়ে ওঠা বনায়নের গাছ কেটে নিচ্ছে দুর্বৃত্তরা। দিনের পর দিন এসব গাছ কেটে নেওয়া হলেও এ বিষয়ে প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়রা বলছেন, নদীর চরে বনায়ন অঞ্চলে দিন-রাত সমানতালে করাত, কুড়াল দিয়ে গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে সংঘবদ্ধ কয়েকটি চক্র। অন্যদিকে যেখানে সেখানে গর্ত খুঁড়ে মাছ শিকারের ফাঁদ তৈরি করা হয়েছে। শিকারিরা তাদের সুবিধার্থে বনায়নের গাছ কেটে সাবাড় করে ফেলছে। গর্তে পানি আটকে থাকায় সেখানে নতুন গাছও জন্মাতে পারছে না। ফলে দিন দিন ধ্বংস হচ্ছে চর বনায়ন। অথচ বহু বছর ধরে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও ছোট-বড় দুর্যোগে প্রাচীর হিসেবে উপকূলীয় এলাকাকে রক্ষা করছে এসব গাছ। এ বিষয়ে বারবার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে প্রশাসনকে জানালেও তারা কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না।
জানা গেছে, খোলপেটুয়া নদীতে প্রায় ৭০০ বিঘা জায়গাজুড়ে একটি বড় চর জেগে ওঠে। এখানে প্রথমে স্থানীয়রা বনায়ন শুরু করলেও পরবর্তীতে এটি সুন্দরবনসংলগ্ন হওয়ায় নদীর জোয়ারে ভেসে আসা নানা গাছের ফল চরে আটকে জন্ম নেয় নতুন গাছ। এতে নদীর প্রায় ৭০০ বিঘা জায়গাজুড়ে বেড়িবাঁধ ঘেঁষে চরে গড়ে ওঠে সবুজ ঘন বন।
পদ্মপুকুর ইউনিয়নের পাতাখালী গ্রামের খোকন সরদার বলেন, আগে চরে প্রচুর গাছ ছিল। এখন চর প্রায় ফাঁকা হয়ে পড়েছে। গাছ কাটার শব্দ যাতে লোকালয়ে না আসে, সেজন্য করাত দিয়ে কাটা হয়। আবার অনেক সময় গাছ কেটে রেখে যায়, দুই-এক দিন পর সেই গাছ নিয়ে যায়। যাতে মানুষকে বোঝানো যায় গাছটা মারা গেছে, তাই মরা গাছ কেটে নেওয়া হচ্ছে। এভাবে কয়েক মাসের মধ্যে কয়েক হাজার গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। যা আজও চলমান।
এ বিষয়ে পদ্মপুকুর ইউনিয়নের ৮৩ নং পশ্চিম পাতাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস. এম রুহুল কুদ্দুস বলেন, গাবুরার খোলপেটুয়া গ্রামের কিছু লোক, পদ্মপুকুরের ৮ নং ওয়ার্ড পূর্ব পাতাখালী গ্রামের দক্ষিণ পাড়ার ২৫ থেকে ৩০ জন বাসিন্দা এবং ওই বন সংলগ্ন ওয়াপদার ওপরে বসবাসরত লোকজন সরাসরি এ বন নিধনে জড়িত। এ ছাড়াও স্থানীয় কয়েকজন চিহ্নিত মাদকসেবী মাদকের টাকা সংগ্রহ করতে এ বনের গাছ কেটে বিক্রি করে। আবার হরিণা চিংড়ির রেণু ধরার জন্য নির্ধারিত কিছু ব্যক্তি এ বনের মধ্যে গাছ কেটে শতাধিক গর্ত তৈরি করেছে। এর ফলে একদিকে ক্রমাগত পুরাতন গাছ নিধন হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন চারাগাছ জন্মাতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। ইতঃপূর্বে যারা এ বন দেখভালের দায়িত্বে ছিল তারাও ব্যক্তিস্বার্থে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে এ বন উজাড়ের কাজে লিপ্ত ছিল বলে জানান তিনি।
পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথনেট গ্লোবাল-এর নির্বাহী পরিচালক সোহানুর রহমান বলেন, বনের ভেতরে গর্ত করে মাছের পোনা ধরা, আর নির্বিচারে গাছ কাটা পরিবেশের জন্য ভয়ংকর হুমকি। অথচ এসব সামাজিক বন উপকূল রক্ষার প্রাকৃতিক বেষ্টনী হিসেবে কাজ করে। বন ধ্বংস হলে পরিবেশের ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আমজাদুল ইসলাম বলেন, খোলপেটুয়া নদীর চরে গড়ে ওঠা বনায়নের গাছ কেটে নেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। কিছু দুর্বৃত্ত চুরি করে এসব গাছ কাটছে এবং পাচার করছে।
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. রনী খাতুন বলেন, চর বনায়নের গাছ কাটা বে-আইনি। এখনই স্থানীয় দুই চেয়ারম্যান ও সামাজিক বন বিভাগকে জানাচ্ছি। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে প্রশাসনও সরাসরি ব্যবস্থা নেবে।