× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইলিশ শিকারে নিষেধাজ্ঞা

মনপুরায় জেলেদের দীর্ঘশ্বাস, কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ

সোহাগ মাহমুদ সৈকত, মনপুরা (ভোলা)

প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:৫২ এএম

মনপুরায় জেলেদের দীর্ঘশ্বাস, কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ

মা ইলিশ সংরক্ষণে ৩ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে ২৫ অক্টোবর রাত ১২টা পর্যন্ত পদ্মা-মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। এ খবরে উপকূলজুড়ে জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীদের মধ্যে নেমে এসেছে হতাশার ছায়া। মনপুরা উপকূলের অন্তত অর্ধ লাখ জেলের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।

আগের নিষেধাজ্ঞার সময়গুলোতে রোজগার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জেলেরা পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর দিন কাটান। জেলেরা বলছেন, বছরজুড়ে নিষেধাজ্ঞা চলাকালে সরকার নামমাত্র চাল সহায়তা দিলেও তা অধিকাংশ জেলে পান না। অনেকে জেলে নন, তারাও এ সহায়তা পাওয়ায় প্রকৃত জেলেরা বঞ্চিত হন। এ নিষেধাজ্ঞার জাঁতাকলে তাই ধারদেনায় বছর বছর জর্জরিত জেলেরা। তবে ভরা মৌসুমেও বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরায় মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরে আশানুরূপ ইলিশের দেখা মিলছে না। 

প্রতিবছর এ সময়ে নদী-সাগরজুড়ে ইলিশের ছড়াছড়ি থাকলেও এবার জেলেদের জালে ধরা পড়ছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাজারো জেলে পরিবার। নিষেধাজ্ঞার কারণে শুধু জেলেরাই নয়, ক্ষতির মুখে পড়বেন আড়তদার, ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় বাজারের মাছ বিক্রেতারাও।

মূলত প্রাকৃতিক কারণে এ বছর মাছের মৌসুমের প্রতিটি অমাবস্যা ও পূর্ণিমার তিথিতে সাগরে সতর্কতা সংকেত থাকায় জেলেরা সাগরে যেতে পারেননি। এ কারণে ইলিশ শিকার হয়নি। যার বিরূপ প্রভাব পড়েছে মোকামসহ সারা দেশের ইলিশ বাজারের ওপর। এমন পরিস্থিতিতে শত কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা । 

স্থানীয় জেলেরা বলছেন, সাগরে বা নদীতে ইলিশ থাকলেও আগের মতো আর ধরা পড়ছে না। সম্প্রতি কিছু সময় মাছ পেলেও নিষেধাজ্ঞার খবরে আবারও তারা হতাশ। গত বছর নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছিল ১২ অক্টোবর থেকে, কিন্তু এ বছর তা এগিয়ে আনা হয়েছে ৩ অক্টোবর থেকে। ফলে সংশ্লিষ্টরা তারিখ পুনর্বিবেচনার দাবি তুলেছেন জেলেরা।

মনপুরার বিভিন্ন ঘাট থেকে প্রতিদিন হাজারো জেলে নদী ও সাগরে মাছ ধরতে গেলেও অনেক সময় খালি জাল টেনে ফিরতে হচ্ছে। যেসব নৌকায় অল্প ইলিশ ধরা পড়ছে, তা দিয়ে শ্রমিকের মজুরি ও জ্বালানির খরচই মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে চরম অর্থকষ্টে পড়েছেন জেলেরা। বাজারেও ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে হু-হু করে।

মনপুরার সবচেয়ে বড় ঘাট রামনেওয়াজ মাছঘাট এলাকার সমুদ্রগামী জেলে মামুন তার দুর্দশার কথা বলছিলেন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদককে। কথা বলতে গিয়ে তার গলা ধরে আসে। বলেন, গত দুই বছরে নিষেধাজ্ঞা পালন করতে গিয়ে তিনি প্রায় ১০ লাখ টাকা ঋণগ্রস্ত হয়েছেন। পরিবার নিয়ে এখন চরম দুর্দশার মধ্যে আছেন। মাছ ধরে যে টাকা আয় করেন, তা দিয়ে ঋণ শোধ করে হাতে কিছু থাকে না। ফলে দুর্দশা তার পিছু ছাড়ছে না।

মাস্টারহাট এলাকর জেলে হোসেন মাঝি বলেন, কিস্তির বোঝা মাথায় নিয়ে প্রতিদিন নদীতে জাল ফেলছি । কিন্তু ভরা মৌসুমেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশ মিলছে না। হতাশা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে আমাদের। জাটকা ধরা আর অবৈধ জাল ব্যবহারের কারণে নদীগুলো ইলিশশূন্য হয়ে পড়ছে।

মৎস্য ব্যবসায়ী মো. জাহাঙ্গীর মাঝি বলেন, পরিবার চালানো এখন ভীষণ কষ্টকর হয়ে গেছে। শুধু জেলেরাই নয়, কর্মহীন হয়ে পড়েছেন আমার ট্রলারে থাকা শ্রমিকদের মত অনেক শ্রমিক। ইলিশের সরবরাহ কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ী, আড়তদার এবং স্থানীয় বাজারের বিক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেক আড়তদার ঋণ করে নৌকা ও জাল কিনেছিলেন, এখন ঋণ শোধ করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে অনেকে পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবছেন।

রামনেওয়াজ মাছঘাট মৎস্য ব্যবসায়ী মো. লিটন হাওলাদার বলেন, ২০ বছর ধরে আমি ইলিশ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ইলিশই আমাদের একমাত্র জীবিকার উৎস। এখন কিছু মাছ পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু নিষেধাজ্ঞার তারিখ আগাম করায় আমরা হতাশ। এতে আমরা আরও ঋণের বোঝায় পড়ে যাচ্ছি।

৩৬৫ দিনের মনপুরার বিভিন্ন সময়ে ১৪০ দিনই নিষেধাজ্ঞা

মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, দেশের নদ-নদী ও বঙ্গোপসাগরে ইলিশসহ অন্যান্য মাছের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে ১৪৮ দিনই মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকে। অক্টোবরে মা ইলিশ সংরক্ষণে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা, মার্চ-এপ্রিল মাসে ইলিশের ছয় অভয়াশ্রমে ৬০ দিনের নিষেধাজ্ঞা এবং এরপর ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত সাগরে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা থাকে। এর বাইরে জাটকা রক্ষায় ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ৮ মাসের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই সময়ে নদ-নদীতে সাড়ে চার ইঞ্চির কম ব্যাসের জাল ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

এ নিষেধাজ্ঞার সময় সরকার যে খাদ্যসহায়তা দেয়, তা সব জেলে পান না বলেও অভিযোগ জেলেদের । আবার চাহিদার তুলনায় খুব কম চাল দেওয়া হয়। এ সহায়তা বিতরণেও রয়েছে নানামুখী অনিয়ম। তাই এ সময় বিকল্প কোনো কর্মসংস্থান না থাকায় জেলেরা পরিবার নিয়ে ভীষণ কষ্টে দিন কাটান।

মনপুরা ক্ষেত্রসহকারী মনির হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশ কে বলেন, মনপুরায় দীর্ঘদিন কর্মকর্তা না থাকায় কাজ করতে কষ্ট হচ্ছে। তবে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার আগেই মনপুরায় মৎস্য কর্মকর্তা দেবে এবং আমরা অভিযান সফল করতে পারব। অভিযান সফল হলে ইলিশের উৎপাদন বাড়বে ।

মনপুরায় অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা লালমোহন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আলী আহাম্মদ আখন্দ প্রতিদিনের বাংলাদেশ কে বলেন, ডুবোচর, প্রতিকূল আবহাওয়া, অতিরিক্ত মাছ শিকার এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে ইলিশের প্রজনন ও মজুদে প্রভাব পড়তে পারে। সরকার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই মা ইলিশ রক্ষায় এই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আশা করি এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে নদী ও সাগরে বড় ইলিশের প্রাচুর্য বাড়বে। তখন জেলেরা আরও বেশি মাছ ধরতে পারবেন, যা তাদের জীবনে স্বস্তি আনবে। তবে প্রতিবছরই সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়ছে। সহায়তার বাইরেও সরকার বিকল্প জীবিকায়নের বিষয়টি সক্রিয়ভাবে ভাবছে। এরই মধ্যে এর কিছু পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে।

অপরদিকে ৩ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে ২৫ অক্টোবর  পর্যন্ত ২২ দিন ‘ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান-২০২৫’ উপলক্ষে ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন সংক্রান্ত উপজেলা টাস্কফোর্স কমিটির প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা মৎস্য অফিসের আয়োজনে উপজেলা পরিষদ হলরুমে ওই সভায় মা ইলিশ সংরক্ষণের বিষয়ে আলোচনা করা হয়।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা