পর্যটন নগরী
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ০২ অক্টোবর ২০২৫ ১২:৩৬ পিএম
আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৫ ১২:৩৮ পিএম
খুরুশকুল ব্রিজ এলাকায় ফেলা আবর্জনার স্তূপের দৃশ্য। প্রবা ফটো
বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের শহর কক্সবাজার আজ দূষণ, অপরিকল্পিত স্থাপনার চাপে জর্জরিত। স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) ছাড়াই চলছে শত শত হোটেল-মোটেল। ময়লা-আবর্জনা সরাসরি যাচ্ছে সমুদ্রে। প্রশাসনিক নজরদারি না থাকায় পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) আইনের প্রয়োগ নেই। এই প্রবাহ অব্যাহত থাকলে সমুদ্রের পানির মান নষ্ট হয়ে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে। অন্যদিকে স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর নজরদারি না থাকায় দখলদাররা দিনের পর দিন দখল বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।
শহরের গোলদিঘির পাড়, লালদিঘির পাড়, খুরুশকুল ব্রিজ এলাকা কিংবা বার্মিজ মার্কেটÑ যে পথেই যাওয়া হোক না কেন, চোখে পড়েছে ময়লার স্তূপ। খুরুশকুল সেতুর পাশের বিশাল আবর্জনার স্তূপ এখন স্থানীয়দের নিত্যসঙ্গী। বৃষ্টির দিনে দুর্গন্ধ আরও অসহনীয় হয়ে ওঠে। বার্মিজ মার্কেট এলাকার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশেও জমে থাকে ময়লা।
কক্সবাজারে পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল ও কটেজ আছে। কিন্তু হাতে গোনা কয়েকটিতে রয়েছে এসটিপি। বাকি হোটেল-মোটেলের বর্জ্য সরাসরি নালা হয়ে চলে যাচ্ছে বাঁকখালী নদীতে। সেখান থেকে বঙ্গোপসাগরে পড়ে। ইচ্ছেমতো চলছেন হোটেল-মোটেলের মালিকরা। প্রশাসন নীরব। এখানে নতুন ভবনেও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা নেই।
কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, প্রতিদিন গড়ে লাখো পর্যটক এখানে অবস্থান করেন। কিন্তু হোটেলে এসটিপি না থাকায় তাদের ব্যবহৃত বর্জ্য সরাসরি সমুদ্র বা নদীতে গিয়ে মিশছে। সরকারকে সব হোটেল-মোটেলে এসটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক করতে হবে। শহরের জন্য সেন্ট্রাল এসটিপি দ্রুত নির্মাণ, নিয়মিত ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে। ইসিএ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন ও নতুন ভবন নির্মাণের আগে পরিবেশ ছাড়পত্র নিশ্চিত করতে হবে।
পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় আইন কার্যকর নয়
জানা যায়, ১৯৯৯ সালে সরকার কক্সবাজার সৈকতকে ‘পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ (ইসিএ) ঘোষণা করে। গেজেটে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়Ñ সৈকতের বালিয়াড়ি ও বেলাভূমিতে কোনো স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) রিট করলে হাইকোর্ট জোয়ার-ভাটার লাইন থেকে ৩০০ মিটার এলাকা ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোন’ ঘোষণা করে। কিন্তু সেই আদেশও বারবার উপেক্ষিত হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়নের নোটিস দিলে জেলা প্রশাসন লোকদেখানো উচ্ছেদ অভিযান চালায়।
পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার সভাপতি এইচএম এরশাদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, দুর্গন্ধে নাক চেপে চলতে হয়। এতে কক্সবাজারের আকর্ষণ কমে যাচ্ছে। পুরনো হোটেলগুলোতে এসটিপি ছিল না। এখনও নতুন হোটেলেও সেটি নেই। ফলে পুরো শহরই ক্রমে দূষণে ডুবে যাচ্ছে।
বৃষ্টিতে দ্বিগুণ হয় দুর্ভোগ
স্থানীয়রা জানান, বর্ষা এলেই খুরুশকুল ব্রিজের পাশের ময়লার স্তূপ থেকে পানি গড়িয়ে যায় রাস্তায়। দুর্গন্ধে মানুষ চলাচল করতে পারে না। শুধু পর্যটক নয়, স্থানীয়দেরও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। ময়লা ফেলানো হয় রাস্তাঘাট, খোলা মাঠ কিংবা ড্রেনে। সরেজমিন ঘুরে এসব দেখা যায়।
প্রশাসনের সীমাবদ্ধতার কথা জানালেন পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের পরিচালক জমির উদ্দিন। তিনি বলেন, কক্সবাজারে তিন শতাধিক হোটেল-মোটেলকে এসটিপি স্থাপনের নোটিস দেওয়া হয়েছে। তবে স্থান অভাবে অনেক হোটেলে তা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার সমন্বয়ে একটি সেন্ট্রাল এসটিপি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু পৌরসভা বিলুপ্তির কারণে এ প্রকল্পে দেরি হচ্ছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (পর্যটন সেল) আজিম খান বলেন, ‘যে হোটেলগুলোতে এসটিপি নেই, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তারকা মানের হোটেলগুলোতে অবশ্যই এসটিপি স্থাপন করতে হবে।
সম্প্রতি ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘ইসিএ এলাকায় স্থাপনা উচ্ছেদ প্রক্রিয়া অনেকটা টম অ্যান্ড জেরি কার্টুনের মতো। প্রশাসন ভেঙে দিলেও আবার নতুন স্থাপনা তৈরি হয়। কার্যকর উদ্যোগ না নিলে কক্সবাজার পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।’
কক্সবাজারের নবাগত জেলা প্রশাসক আ. মান্নান বলেন, ‘ইসিএ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। সব ভবন মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী নির্মাণ করতে হবে। দূষণমুক্ত পর্যটন নগরী গড়তে এসটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হবে।’