দৌরাত্ম্য থামেনি অটোরিকশার
আহমদ মারুফ, সিলেট
প্রকাশ : ০২ অক্টোবর ২০২৫ ১১:০৪ এএম
সিলেট নগরজুড়ে ব্যাটারিচালিত রিকশার দৌরাত্ম্য থামেনি। অনুমোদনহীন বেপরোয়া গতির এই অটোরিকশা বাড়াচ্ছে দুর্ঘটনা। বাড়ছে বিদ্যুতের অপচয়।
সূত্র জানায়, প্রশাসন কঠোর হওয়া সত্ত্বেও সড়কে থামেনি অবৈধ অটোরিকশার দৌরাত্ম্য। নগরের রাজপথ থেকে অলিগলি- সর্বত্র দাপিয়ে চলছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক ও সিএনজি অটোরিকশা। অভিযানের নির্ধারিত সময় শেষে ফের ‘যেই লাউ, সেই কদু’। অনেকটা চোর-পুলিশ খেলছে এসব অবৈধ যানের চালকরা। শহরের আনাচে কানাচে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল অব্যাহত রয়েছে।
নগরীতে জেলা প্রশাসন, এসএমপি ও নগর কর্তৃপক্ষের যৌথ অভিযানে এসব যান আটকের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন নগরবাসী। এই অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিন নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে আটক করা হচ্ছে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা। গত এক সপ্তাহের অভিযানে দুই শতাধিক অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা আটক করা হয়েছে। এমন কার্যক্রমে স্বস্তি প্রকাশ করেন নগরবাসী।
তবে নগরের সড়কে অভিযান চালালেও শো-রুমগুলোতে অবৈধ ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা প্রকাশ্যে বিক্রি করা হচ্ছে। এগুলো যেন নজর এড়িয়ে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষের। ব্যাটারিচালিত রিকশা কেবল সড়কেই অবৈধ, শো-রুমে বৈধ-এমন প্রশ্ন এখন নগরবাসীর।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ব্যাটারিচালিত অবৈধ টমটম ও অটোরিকশার অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) থেকে অনেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়েছেন পার্টস এবং ব্যাটারির ব্যবসার কথা উল্লেখ করে। বাস্তবে করছেন ঠিক উল্টা। সেই ট্রেড লাইসেন্সের কপি দেখিয়ে বেশির ভাগ গ্যারেজ মালিক চার্জিং পয়েন্ট খুলে বসেছেন।
ট্রেড লাইসেন্স ও বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে সহায়তা করছে সিসিকের ট্রেড লাইসেন্স। তাতে সংশ্লিষ্টতা মিলেছে ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা আদায়কারী, পরিদর্শক ও বিদ্যুৎ বিভাগের অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বশীলদের। তারা সরেজমিন প্রতিবেদন না দিয়ে শোরুম মালিকদের ব্যবসার সুযোগ করে দিচ্ছেন। বিদ্যুৎ বিভাগের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ।
এভাবে অবৈধ শোরুম মালিক ও গ্যারেজে চার্জিং পয়েন্টের মালিকরা নিয়মবহির্ভূতভাবে সংযোগ দিয়েছেন। ফলে বছরের পর বছর অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে চক্রটি। অথচ সিসিকের আদায়কারীর দায়িত্বরতরা কোনো অ্যাকশনে যাওয়া বৈকি কোনো আপত্তি করেননি। এ কারণে বছরের পর বছর ধরে কেবল ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করে নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। তা যেন কিছুতেই দৃষ্টি গোচর হচ্ছে না দায়িত্বরতদের।
অপরদিকে, বেশিরভাগ ব্যাটারিচালিত টমটম ও অটোরিকশার ব্যবসায়ীদের নেই কোনো ট্রেড লাইসেন্স। লাইসেন্স এক ধরণের, আর ব্যবসা চলছে আরেক ধরণের। নগরবাসীর অনেকের অভিযোগ, সড়কের অভিযান শুধুমাত্র লোক দেখানো। রিকশা চালকরা সবাই দরিদ্র, তাদের ঘাড়ে আইনের প্রয়োগ না ঘটিয়ে প্রভাবশালী শোরুম মালিকদের ধরা হচ্ছে না। ব্যবসার নামে যারা এগুলো সরবরাহ করছেন, তাদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না প্রশাসন। এছাড়াও সরকারি-বেসরকারি অনেকেই বিভিন্ন শোরুম মালিকের কাছ থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। যে কারণে এসব শোরুম মালিকরা থেকে যাবে ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
অবশ্য ব্যাটারি চালিত অবৈধ অটোরিকশার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে স্থানীয় প্রশাসন। কোনোভাবেই নগরীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলতে দেওয়া যাবে না। জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে কাজ করে যাচ্ছে সিসিক। কিন্তু সড়কে ব্যাটারিচালিত অবৈধ রিকশা প্রতিহত করতে পারলেও, শোরুম বন্ধ করা হচ্ছে না। শোরুমের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নিÑ এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও ব্যাটারি চালিত অবৈধ রিকশার বিরুদ্ধে অভিযান চালালেও অবৈধ টমটমের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। ব্যাটারিচালিত অবৈধ রিকশা নগরীর সড়কগুলোতে হ্রাস পেলেও প্রতিটি পয়েন্টে টমটমের দাপট রয়েছে আগের মতই। ফলে অভিযানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। প্রশাসক নগরীতে ব্যাটারি চালিত অবৈধ টমটম ও অটোরিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও রহস্যজনক কারণে এসব প্রস্তুত ও বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছেন নগরবাসী। নগরীর প্রতিনিধিত্বশীল একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানা যায়।
সিসিকের ভারপ্রাপ্ত প্যানেল মেয়র ও মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী বলেন, পরিকল্পনাবিহীন কোনো কর্মই কখনো সুফল বয়ে আনে না। মূল বিষয়ের প্রতি আমাদের খেয়াল না করে আমরা পার্শ্বিক বিষয় নিয়ে পড়ে আছি।
তিনি বলেন, ব্যাটারিচালিত অবৈধ রিকশা ও টমটমের উৎপাদন, বিক্রয় ও বিপণনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে শুধুমাত্র চালকদের পেছনে ছুটলে হবে না। তাই আগে তার মূলোৎপাটন করতে হবে না। প্রথমেই এসবের পেছনে যাদের ইন্ধন রয়েছে, যারা এর থেকে বড় ধরনের সুবিধাভোগী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে সবকিছু পণ্ডশ্রম ছাড়া আর কিছুই হবে না।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস্ জার্নালিস্ট কমিশন, সিলেট জেলা সভাপতি ফয়সল আহমেদ বাবলু বলেন, প্রশাসন চেষ্টা করছে ব্যাটারিচালিত অবৈধ রিকশা ও টমটম বন্ধের জন্য। কিন্তু শুধু সড়কে অভিযান চালালে হবে না। এর উৎসস্থলেও আঘাত হানতে হবে। আর না হলে দিনশেষে কোনো ফল মিলবে না। কেননা একদিকে আপনি সড়কে অভিযান চালাচ্ছেন, অন্যদিকে প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব অবৈধ গাড়ির অবাধ ব্যবসা অভিযানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। তাই শোরুম গুলোতে সবার আগে অভিযান চালাতে হবে।
সিলেট বিভাগ কল্যাণ সংস্থার সভাপতি এহসানুল হক তাহের বলেন, সড়কে অভিযান আর শোরুমে নিরবÑ এটি এক ধরনের প্রতারণা। যা সড়কে অবৈধ, তা সকল ক্ষেত্রেই অবৈধ। তাই সবার বিরুদ্ধে সমান ব্যবস্থা নিতে হবে। এমনকি ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন আর টমটমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন না, তা হবে না।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত অবৈধ টমটম ও রিকশার শোরুম ব্যবসায়ীদের বিরুদ্বে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিগগিরই ফলাফল দেখতে পাবেন।’
সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাই রাফিন সরকার বলেন, ব্যাটারিচালিত অবৈধ টমটম ও রিকশার শোরুম ব্যবসায়ী ও গ্যারেজে যারা চার্জিং পয়েন্ট তৈরি করেছে, আমরা সরেজমিন তালিকা তৈরি করেছি। কে কোন ধরণের ট্রেড লাইসেন্স নিয়েছে এবং তার অপব্যবহার করছে সেই তালিকা ও ছবি আমরা প্রস্তুত করেছি। রাজস্ব শাখার ও প্রচলিত আইন মোতাবেক জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুতই আমরা অভিযান চালাব।
সিলেট নগরীতে রয়েছে শতাধিকের বেশি প্রতিষ্ঠান। যারা সরাসরি ব্যাটারিচালিত অবৈধ রিকশা ও টমটম ব্যবসায় জড়িত। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান বিদ্যুতের চার্জিং স্টেশন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, কেউ গ্যারেজ ভাড়া দিয়ে ব্যবসা করছে। আবার কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান সরাসরি এগুলো তৈরি ও বাজারজাতের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। তবে একাধিক প্রতিষ্ঠান সিলেটের বাইরে থেকে আমদানি করছে বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নগরীর ৪, ৫ ও ৬নং ওয়ার্ডে ছয়টি প্রতিষ্ঠান ব্যাটারিচালিত অবৈধ অটোরিকশা ও টমটম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। চার্জিং স্টেশন, দুটি গ্যারেজ ও চারটি শোরুম ও মেরামতকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে দুটি। সিসিকের তথ্য অনুসারে তাদের কারো কাছে ব্যবসার অনুমতিপত্র নেই।
নগরীর ৭নং ওয়ার্ডে ছয়টি প্রতিষ্ঠান ব্যাটারিচালিত অবৈধ অটোরিকশা ও টমটম ব্যবসায় জড়িত। জনতা ট্রেডার্স এবং ফাহিমা রিকশা ছাড়া আর কারও কাছে ব্যবসার অনুমতিপত্র নেই। একটি চার্জিং স্টেশন ছাড়া বাকিগুলো গ্যারেজের ব্যবসায় জড়িত। নগরীর ৯নং ওয়ার্ডে শোরুম ও গ্যারেজসহ সাতটি প্রতিষ্ঠান এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। জামান অটো পার্টস এবং তাব্বি অটো ছাড়া আর কারও ব্যবসার অনুমতিপত্র নেই। নগরীর ১০নং ওয়ার্ডে ২০টির বেশি প্রতিষ্ঠান গ্যারেজ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। যাদের কারও ব্যবসার অনুমতিপত্র নেই।
নগরীর ১২নং ওয়ার্ডে তিনটি প্রতিষ্ঠানের খোঁজ পাওয়া যায়। জনতা এন্টারপ্রাইজের পক্ষ থেকে সিসিক থেকে যদিও পার্টসের ব্যবসার অনুমতি নেওয়া হয়েছে, বাস্তবে তারা অবৈধ রিকশা ও টমটমের ব্যবসা পরিচালনা করছে। অপর দুটির একটি গ্যারেজ এবং একটি চার্জিং পয়েন্ট হিসেবে রয়েছে।
নগরীর ১৩নং ওয়ার্ডে রয়েছে মোট ১১টি প্রতিষ্ঠান। এরমধ্যে মেসার্স আমিনা ট্রেডার্স নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাটারি ও মেরামতের জন্য এবং সাফা এন্টারপ্রাইজেরও একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাটারি ও মেরামতের ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে। বাকি আট প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স নেই। তবে সবই অবৈধ ব্যাটারি চালিত টমটম ও রিকশার শোরুম।
নগরীর ১৭নং ওয়ার্ডে রয়েছে চারটি প্রতিষ্ঠান যারা রিকশা গ্যারেজের ট্রেড লাইসেন্স নিয়েছে। বাস্তবে ব্যাটারিচালিত রিকশার ব্যবসায় জড়িত। অপরদিকে ১৮ ও ১৯ নং ওয়ার্ডে চারটি, ২১নং ওয়ার্ডে তিনটি অটোরিকশা গ্যারেজ রয়েছে। ২৪ ও ২৫নং ওয়ার্ডে রয়েছে আরো ১১টি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্ট।
২৬ ও২৭ নং ওয়ার্ডে শোরুমসহ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সাতটি গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে। নগরীর ২৯নং ওয়ার্ডে পাঁচটি, ৩০নং ওয়ার্ডে ছয়টি, ৩২ ও ৩৩নং ওয়ার্ডে ১০টি এবং ৩৪ ও ৩৫নং ওয়ার্ডের ১০ সহ উল্লিখিত সব ওয়ার্ডে শোরুম, চার্জিং পয়েন্ট ও অধিক গ্যারেজ রয়েছে।