মাশরুর মুর্শেদ, খুলনা
প্রকাশ : ০২ অক্টোবর ২০২৫ ১০:৫১ এএম
দেশের কৃষি উৎপাদন দীর্ঘদিন ধরেই রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরশীল। খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়াতে ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সারের ব্যবহার দিন দিন বেড়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, প্রতিবছর দেশে গড়ে ৫০ থেকে ৫৫ লাখ টন রাসায়নিক সার ব্যবহার হয়। এর মধ্যে ইউরিয়ার ব্যবহারই প্রায় ২৬-২৭ লাখ টন। সরকারের ভর্তুকি সত্ত্বেও সারের বাজারদর বাড়তে থাকায় কৃষকের কপালে ভাঁজ পড়ছে।
কিন্তু খুলনার উপকূলীয় অঞ্চলে এমন একদল কৃষক পাওয়া গেছে যারা প্রমাণ করেছেন, রাসায়নিক সার ছাড়াই ধান চাষ সম্ভব। শুধু সম্ভবই নয়, এটি কৃষকের জন্য লাভজনকও হতে পারে।
জমিতে আমন ধানের আবাদ করেছেন একেবারেই রাসায়নিক সার ছাড়া। তার পুরো প্রক্রিয়াটিই ছিল ভিন্নধর্মী। বোরো ধান কাটার পর তিনি জমিতে ধৈঞ্চার বীজ বপন করেন। প্রায় দেড় মাস পর ধৈঞ্চা গাছ বড় হয়ে গেলে তা কেটে জমির মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেন। স্থানীয়ভাবে এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় সবুজ সার প্রয়োগ। এরপর ওই জমিতেই তিনি আমন ধানের চারা রোপণ করেন।
কৃষক শাহজাহান বলেন, কৃষি অফিসের পরামর্শে ধৈঞ্চা ব্যবহার করেছি। ধান সুস্থভাবে বেড়েছে, একটিও রাসায়নিক সার দিতে হয়নি। এতে আমার প্রায় ৬–৭ হাজার টাকা সাশ্রয় হয়েছে। শুধু তাই নয়, জমির মাটিও আগের তুলনায় অনেক ঝুরঝুরে ও উর্বর মনে হচ্ছে।
তিনি জানান, এখন তার জমিতে বছরে চারটি ফসল হচ্ছে- বোরো ধান, ধৈঞ্চা, আমন ধান ও বিনা চাষে সরিষা। আগে রাসায়নিক সার কিনতে অনেক খরচ হতো, দাম বাড়লেই আমাদের চিন্তা বাড়ত। এখন বুঝতে পারছি বিকল্প পথও আছে।
শাহজাহানের জমি দেখতে প্রতিদিনই আশপাশের গ্রাম থেকে কৃষকেরা ভিড় করছেন। কেউ কেউ নিজের জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে ধৈঞ্চা চাষ শুরু করেছেন। মোহাম্মদনগরের কৃষক আবুল বাশার বলেন, ‘আমার জীবনে প্রথমবার রাসায়নিক সার ছাড়া ধান চাষ দেখলাম। ফলনও খারাপ হয়নি। আগামী বছর আমার ১০ বিঘা জমিতেও ধৈঞ্চা লাগাব।’
চক্রাখালীর আরেক কৃষক মো. শাজাহান জানান, এই পদ্ধতিতে ধান চাষে খরচ কম এবং মাটির উর্বরতা দীর্ঘদিন টিকে থাকে। তার ভাষায়, আমাদের মতো কৃষকের জন্য সবচেয়ে বড় বিষয় হলো খরচ কমানো। সবুজ সার সেটাই করছে।
কৃষি অধিদপ্তরের হিসাবে, এক হেক্টর জমিতে ধৈঞ্চা মাটির সঙ্গে মেশালে ৬০-৮০ কেজি নাইট্রোজেন পাওয়া যায়। এটি প্রায় ৪-৫ বস্তা ইউরিয়া সারের সমান। শুধু নাইট্রোজেন নয়, মাটির জৈব পদার্থও বাড়ে, জমির অনুজীব সক্রিয় হয় এবং ধানের শিকড় সহজে পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জীবনানন্দ রায় বলেন, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা ও দীর্ঘদিনের রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণে মাটির উর্বরতা কমে যাচ্ছে। এজন্য আমরা কৃষকদের ধৈঞ্চা চাষে উৎসাহিত করছি। শুড়িখালী গ্রামের এই উদ্যোগ অন্যদের জন্য উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি জানান, ইতিমধ্যেই এ অঞ্চলের প্রায় ১১০ বিঘা জমিতে কৃষকেরা আগামী মৌসুমে ধৈঞ্চা লাগানোর পরিকল্পনা করেছেন।
খুলনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জেলার ১১টি উপজেলায় মোট ২৮০ হেক্টর জমিতে ধৈঞ্চার আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৯ হেক্টরে সবুজ সার হিসেবে ধৈঞ্চা ব্যবহার করে আমন ধানের চাষ হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবুবকর সিদ্দিক বলেন, তরমুজ কাটার পর পতিত জমি কাজে লাগাতে কৃষি অফিস থেকে ২১০ জন কৃষককে পাঁচ কেজি করে ধৈঞ্চার বীজ দেওয়া হয়েছে। ধৈঞ্চার বীজ রোপনের ৪৫ দিন পর তা মাটিতে মিশিয়ে ধান লাগানো হয়। এতে খরচ কমে এবং কৃষক লাভবান হয়।
খুলনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নজরুল ইসলাম বলেন, ধৈঞ্চা শুধু সবুজ সার নয়, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য অত্যন্ত কার্যকর। রাসায়নিক সার সীমিত পরিমাণে ব্যবহার করলে জমির ভারসাম্য থাকে, কিন্তু অতিরিক্ত ব্যবহার করলে জমি শক্ত হয়ে যায়। ধৈঞ্চা সেই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে।
বাংলাদেশে বর্তমানে জৈব সারের ব্যবহার মোট সারের মাত্র ৫–৬ শতাংশ। অথচ শুধু ইউরিয়া সারের ভর্তুকিতেই প্রতিবছর সরকারের ব্যয় প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা। কৃষিবিদদের মতে, এই অর্থের একটি অংশ যদি সবুজ সার প্রসারে ব্যয় করা হয়, তাহলে কৃষকের খরচ সাশ্রয়ের পাশাপাশি সরকারের ভর্তুকির বোঝাও কমবে।
পরিবেশবিদ ড. মাহমুদা খাতুন বলেন, রাসায়নিক সার উৎপাদন ও ব্যবহার উভয়ই গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন বাড়ায়। ধৈঞ্চার মতো সবুজ সার ব্যবহারে শুধু কৃষিই টেকসই হবে না, পরিবেশও রক্ষা পাবে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত মাটিতে এটি কার্যকর সমাধান হতে পারে।
শুড়িখালীর অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করেছে যে রাসায়নিক সার ছাড়াই ধান চাষ করা সম্ভব এবং তা লাভজনকও হতে পারে। এখন যদি এই অভিজ্ঞতা বৃহৎ পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে কৃষকের উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমবে, রাসায়নিক সারের আমদানি নির্ভরতা হ্রাস পাবে, জমির উর্বরতা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাবে এবং লবণাক্ত জমিতেও টেকসই খাদ্য উৎপাদন সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ জন্য সরকারের সহায়তা, কৃষি গবেষণা এবং কৃষক পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। তাহলেই ব্যয়সাপেক্ষ রাসায়নিক সারের চক্র থেকে বের হয়ে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৃষির পথে অগ্রসর হতে পারবে।