খুলনা অফিস
প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৫৮ এএম
সুন্দরবন মানেই জীবনের সঙ্গে লড়াই। একদিকে জীবিকার সন্ধানে নদী-খালে নামা, অন্যদিকে মৃত্যুভয় সবসময় পিছু নেয়। মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিকালে সেই ভয়াল মৃত্যুই গ্রাস করল সুব্রত মণ্ডলকে। বয়স মাত্র ৩২। জীবনের সমস্ত স্বপ্ন, সংসারের ভরসা সবকিছু এক নিমিষে হারিয়ে গেল করমজল খালের জলে।
খুলনার দাকোপ উপজেলার ঢাংমারী গ্রামের কুমুদ মণ্ডলের ছেলে সুব্রত পেশায় ছিলেন জেলে। দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের নদী-খালে মাছ আর কাঁকড়া ধরে সংসার চালাতেন। অভাবের সংসার হলেও জীবিকার জন্য নিয়মিত বন বিভাগের অনুমতিপত্র (পাশ) নিয়ে বনে ঢুকতেন। স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা। ঘরে নতুন অতিথির আগমনের অপেক্ষা, আর সেই মুহূর্তে ঘরে ফিরলেন তিনি লাশ হয়ে।
মঙ্গলবার সকালেই পাশ সংগ্রহ করে কয়েকজন সঙ্গীসহ কাঁকড়া ধরতে সুন্দরবনের গভীরে প্রবেশ করেন সুব্রত। আমুরবুনিয়া গ্রাম থেকে হেঁটে জোংড়া এলাকায় পৌঁছে নদী-খাল সাঁতরে পার হয়ে যান তারা। ফেরার পথে বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে করমজল খাল পার হওয়ার সময় হঠাৎই একটি কুমির ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাকে কামড়ে ধরে পানির নিচে টেনে নেয়। সঙ্গে থাকা অন্য জেলেরা প্রাণপণ চেষ্টা করেও সুব্রতকে উদ্ধার করতে পারেননি।
গ্রামবাসীর ভাষায়, এ দৃশ্য ছিল রীতিমতো দুঃস্বপ্নের মতো। ঢাংমারীর ইস্রাফিল বয়াতি বলেন, খবর পেয়ে গ্রামের শতাধিক মানুষ নৌকা, ট্রলার নিয়ে খোঁজে নেমেছিল। সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত খালে তল্লাশি চলে। অবশেষে রাত সাড়ে ১০টার দিকে তার মরদেহ পানির নিচ থেকে উঠাতে সক্ষম হন তারা।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বন বিভাগের করমজল পর্যটন ও বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির জানান, প্রথমে বিকাল পাঁচটার দিকে খালে সুব্রতের মরদেহ ভেসে উঠেছিল। কিন্তু কুমির মুখে নিয়ে আবার পানির নিচে চলে যায়। সাড়ে পাঁচটার দিকে আবার মরদেহ দেখা যায় কুমিরের মুখে। অবশেষে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে কুমিরটি ছেড়ে দিলে কিছুক্ষণ মরদেহ দেখা গেলেও আবার ডুবে যায়। রাত সাড়ে দশটার দিকে মরদেহ উদ্ধার হয়।
সুব্রতের মৃত্যুতে শোকাহত ঢাংমারী গ্রাম। শোকের চেয়ে ভয়ের আবহ যেন আরও বেশি। পরিবারের লোকজন কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। তাঁর স্ত্রী সন্তানসম্ভবাÑ অচিরেই ঘরে নতুন প্রাণ আসার কথা ছিল। কিন্তু সেই আনন্দ এখন শোকে ডুবে গেছে।
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দারা বলেন, সুন্দরবনের সঙ্গে জীবিকার সম্পর্ক যত পুরোনো, ততটাই পুরোনো এই মৃত্যুভয়। নদী-খাল পাড়ি দেওয়ার সময় কুমিরের আক্রমণ প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ বেঁচে ফিরে আসে, কেউ চিরতরে ডুবে যায় বনের জলে।
এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। গতবছরও একই করমজল খালে মোশাররফ হোসেন গাজী নামে এক বনজীবীর মৃত্যু হয়েছিল কুমিরের আক্রমণে। তিনিও মধু সংগ্রহ শেষে ফেরার পথে খাল পার হতে গিয়ে জীবন হারান।
সুন্দরবন উপকূলের মানুষের কাছে কুমিরের আক্রমণ এখন আতঙ্কের সমার্থক শব্দ। তবু পেটের দায়ে, সংসারের টানে তারা প্রতিদিন পা বাড়ান সেই দুঃসহ জীবনের পথে।