এনায়েতুর রহমান, পটুয়াখালী
প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৪৭ এএম
পটুয়াখালীর উপকূলীয় উপজেলা গলাচিপার চরাঞ্চল ও গ্রামীণ হাটবাজারে অনুমোদনহীনভাবে গড়ে উঠেছে একের পর এক ডায়াগনস্টিক সেন্টার। প্রবা ফটো
পটুয়াখালীর উপকূলীয় উপজেলা গলাচিপার চরাঞ্চল ও গ্রামীণ হাটবাজারে অনুমোদনহীনভাবে গড়ে উঠেছে একের পর এক ডায়াগনস্টিক সেন্টার। নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে বছরের পর বছর চলছে এসব কেন্দ্র, যার বেশিরভাগের নেই কোনো নবায়ন, যন্ত্রপাতি বা দক্ষ টেকনোলজিস্ট। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান অনুমোদন ছাড়াই চিকিৎসা সেবা দেওয়ার নামে প্রতিদিন ঠকাচ্ছে সাধারণ রোগীদের, ফেলে দিচ্ছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। স্থানীয় প্রশাসন তালিকা প্রস্তুত ও তাগিদ দেওয়ার কথা বললেও কার্যকর নজরদারির অভাবে বাড়ছে অবৈধ এসব প্রতিষ্ঠানের দৌরাত্ম্য।
পটুয়াখালীর উপকূলীয় উপজেলা গলাচিপার দ্বীপ ইউনিয়ন চর কাজল ও চর বিশ্বাস। এই দুই ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী চর বিশ্বাসের ক্লোজার বাজারে জাহাঙ্গীর মল্লিকের বাড়ির নিচতলায় রয়েছে ডায়াগনস্টিক সেন্টার। কাজল রেখা ডায়াগনস্টিক সেন্টার নামে সাইন বোর্ডে দুজন চিকিৎসকের নাম দেওয়া হয়েছে; যারা সপ্তাহে দুদিন এখানে এসে রোগী দেখছেন। কিন্তু এই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেই কোনো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, রোগ নির্ণয়ের জন্য নেই টেকনোলজিস্ট, নেই অনুমোদনও।
শুধু এই ডায়াগনস্টিক সেন্টারই নয়, এই উপজেলায় অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন হাটবাজারে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার। যে কয়েকটির অনুমোদন রয়েছে তাদেরও অনেকেরই লাইসেন্স নবায়ন পর্যন্ত করা হয় না। অবৈধভাবে চলছে ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো।
গলাচিপা উপজেলার স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় ৩৩টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার নবায়নের জন্য আবেদন করেলেও ২০২১-২০২২ থেকে ২০২৩-২০২৪ সাল পর্যন্ত বেশিরভাগই নবায়নের জন্য আবেদন করেনি। তালিকাভুক্তির মধ্যে তিনটির কোনো অনুমোদন নেই। তবে তালিকার বাইরেও বেশ কয়েকটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে, যা তালিকাভুক্তিকরণের কাজ চলছে।
গত সোমবার সরেজমিন বিভিন্ন গ্রামের বাজার-অলিগলি ঘুরে দেখা যায়, বেশ কয়েকটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার অনুমোদন না নিয়েই চিকিৎসা সেবা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে কলাগাছিয়া ইউনিয়নের খারিজজমা বাজারে ফ্যামিলি কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার (বর্ধিত)। বকুলবাড়ীয়া চৌরাস্তা বাজারে ইসলামিয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টার, রতনদিতালতলী ইউনিয়নের কাটাখালী ডায়াগনস্টিক সেন্টার, চর বিশ্বাস ইউনিয়নেসর ক্লোজার বাজার এলাকায় কাজল রেখা ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড। এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সাইনবোর্ডে মহিলা ডাক্তার দ্বারা সিজার ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি করা হয় লেখা থাকলেও নেই নিয়মিত মহিলা ডাক্তার।
কাজল রেখা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের স্বত্বাধিকারী কাজল রেখা জানান, ডায়াগনস্টিক ব্যবসার নিয়ম-কানুন তার জানা নেই। তার প্রতিষ্ঠানে কোনো যন্ত্রপাতিও নেই। তবে শুধু ডাক্তার যেদিন আসেন, তারাই যন্ত্রপাতি নিয়ে আসে এবং চিকিৎসা সেবাসহ রোগ নির্ণয় করে রিপোর্ট দেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক জানান, উপজেলায় ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো পরিদর্শনে একটি টিম থাকলেও সেন্টারের মালিকরা ওই পরিদর্শন টিমকে ম্যানেজ করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে লাইসেন্স নবায়ন না থাকলেও সমস্যা হয় না।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যকরী পদক্ষেপহীনতায় বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে ও অলিগলিতে বাহারি নাম ও পরিপাটি সাজসজ্জায় গজিয়ে উঠেছে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্যাথলজি পরীক্ষাগার। যার ফলে ভুল রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন গ্রামের রোগীরা।
গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. মেজবাহ উদ্দিন বলেন, সেন্টারের অনুমোদন থাকলেও প্রতি বছর নবায়ন বাধ্যতামূলক। যেসব প্রতিষ্ঠান নবায়ন করেনি, তাদের নবায়ন করার জন্য তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। উপজেলার সব ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নাম তালিকাভুক্ত করার কাজ চলমান রয়েছে। অবৈধভাবে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সিভিল সার্জন বরাবর তালিকা পাঠানো হচ্ছে।
সিভিল সার্জন মোহাম্মদ খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, লাইসেন্স নবায়নের জন্য ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোকে বলা হয়েছে। পাশাপাশি জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়মিত পরিদর্শন অব্যাহত থাকবে।