× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পাহাড়ে অশান্তির নেপথ্যে চাঁদাবাজি

তানভীর হাসান

প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০২৫ ১০:০৩ এএম

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৫ ১০:০৪ এএম

পাহাড়ে অশান্তির নেপথ্যে চাঁদাবাজি

শান্ত পাহাড় হঠাৎই অশান্ত। স্কুলপড়ুয়া কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনার বিচার চাওয়ার নামে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে প্রাণ গেছে তিনজনের। গুইমারায় পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে দোকানপাট ও বসতি। অথচ যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলন, সেই ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে ৬ দিনের রিমান্ডে রয়েছেন। কিন্তু কেন এই আন্দোলন, সেই প্রশ্নের জবাব মিলছে না। 

এদিকে খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলার রামসু বাজার এখন এক শোকের শহরে পরিণত হয়েছে। চারপাশে ধ্বংসস্তূপ, ঝলসে যাওয়া দোকানপাট ও ঘরবাড়ি, ছাইয়ের গন্ধে ভারী হয়ে আছে বাতাস। এক দিনের ব্যস্ত বাজার আজ নিস্তব্ধ- এ যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো এলাকা। এ ছাড়া মারমা কিশোরী সংঘবদ্ধ ‘ধর্ষণের’ শিকার হয়েছে বলে যে অভিযোগ করা হয়েছে তা প্রমাণিত হয়নি। স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদনে ‘ধর্ষণের কোনো আলামত পাননি’ বলে জানিয়েছেন পরীক্ষায় নেতৃত্ব দেওয়া চিকিৎসক। গতকাল মঙ্গলবার খাগড়াছড়ির অবরোধ স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। 

শান্ত পাহাড়ি জনপদ অশান্ত হওয়ার নেপথ্যে কারণ খুঁজতে মাঠে নামে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা। যাদের তদন্তে উঠে আসছে লোমহর্ষক কাহিনী। থেমে যাওয়া আন্দোলনকে ফের চাঙ্গা করে ইউপিডিএফ-এর ছাত্র সংগঠন ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’। আর এতে যোগ দেয় জেএসএস-ইউপিডিএফ- কেএনএফ ও ম্রো ন্যাশনাল পার্টির (এমএনপি) সদস্যরা। যারা সবাই সশস্ত্র সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত। তারাই মূলত অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে সাধারণ জনতাকে মাঠে নামতে বাধ্য করে। কারণ গত ৭ মাসে তিন পার্বত্য জেলায় ১০১টি চাঁদাবাজির ঘটনায় নজরদারিতে ছিলেন এই সংগঠনের নেতারা। আর এসব কিছুর পেছনে রয়েছে পাশের একটি দেশের গভীর চক্রান্ত। মূলত পাহাড়কে অশান্ত করে নিজেদের ফায়দা লোটাই তাদের উদ্দেশ্য বলে সূত্রটি দাবি করেছে।

সূত্র মতে, গত ৭ মাসে পাহাড়ে ১০১টি চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে জেএসএস (শন্তু লারমা) গ্রুপ ঘটিয়েছে প্রায় অর্ধশত ঘটনা। পিছিয়ে নেই ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপ। তারাও ৩০টি ঘটনা ঘটিয়েছে। অন্যদিকে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) আটটি ঘটনায় যুক্ত। এ ছাড়া ১১টি ঘটনায় জড়িত আছে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) আর চারটিতে ম্রো ন্যাশনাল পার্টি (এমএনপি)। সবশেষ ধর্ষণ ঘটনায় তোলপাড়ের আগে গত ২৫ মার্চ খাগড়াছড়ির লারমা বাজারে আগুন দেয় পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা। অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ২৪টি দোকান পুড়ে একেবারে নিঃস্ব হন ৩০ ব্যবসায়ী। ঈদ ও বৈসাবি উৎসবমুখর পরিস্থিতিতে চাঁদা না দেওয়ায় এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়েছে পাহাড়িরা। এর ২০ দিন আগেও একই ঘটনা ঘটায় চাঁদাবাজ গ্রুপগুলো। এভাবে বছরে ৪০০ কোটি টাকারও বেশি চাঁদাবাজি করে পাহাড়ি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো, যা পরে অস্ত্র কেনায় ব্যবহার হয়। আর এই অস্ত্রের বেশিরভাগই পাশের একটি দেশ থেকে সংগ্রহ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে পাহাড় যত অশান্ত থাকবে, অস্ত্র ও গুলির জোগান তত বাড়বে। আর এ কারণে পাহাড়ে অশান্তির পেছনে ওই দেশটির গোয়েন্দারা সব সময়ই কাজ করে আসে।

সূত্র মতে, গত ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর পাহাড়ের শান্তি ফেরাতে কঠোর হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ধারাবাহিক অভিযানে গ্রেপ্তায় হয় শত শত সন্ত্রাসী। অনেকটা কমে আসতে শুরু করে চাঁদাবাজির ঘটনা। এতে কোণঠাসা গোষ্ঠীগুলো পুরনো রূপে ফিরতে একটি উপলক্ষ খুঁজছিল। আর সেই সুযোগ চলে আসে এক কিশোরী ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর। এ ঘটনায় অভিযুক্ত যুবক গ্রেপ্তার হলেও অস্ত্রের মুখে আন্দোলন চালিয়ে নেওয়ার জন্য স্থানীয়দের চাপ দেয় গোষ্ঠীগুলো। ফলে হতাহতের ঘটনা ঘটে। দেশীয় ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহার করা হয় আন্দোলনে।

জানা গেছে, সশস্ত্র চাঁদাবাজদের দাপটে অতিষ্ঠ তিন পার্বত্য জেলার বাসিন্দারা। বাহ্যিকভাবে পাহাড়ের বাসিন্দাদের অধিকার নিশ্চিত করা আর শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে সোচ্চার থাকতে দেখা গেলেও নেপথ্যে এসব সংগঠনের বেশিরভাগ কর্মীই চাঁদাবাজিতে সক্রিয়। আর এ নিয়ে তারা প্রায়ই পরস্পরের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। বেশিরভাগ ভুক্তভোগীই সীমিত আয়ের মানুষ। তালিকায় রয়েছে বিভিন্ন লেক এলাকার লঞ্চ ও বোট মালিক, নৌকার মাঝি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী, মুদিসহ বিভিন্ন পণ্যের দোকানদার, ব্যবসায়ী সমিতি, মাছ, গরু বা সবজি বিক্রেতা, হোটেল-রেস্টুরেন্টের মালিক, সাধারণ চাষি অথবা ফল বাগানের মালিক, চাঁদের গাড়ির মালিকরা।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে বলেন, পাহাড়ে সব রকমের সহিংসতাসহ সমস্যার মূল কারণ হচ্ছে চাঁদাবাজি। এই চাঁদাবাজি বন্ধ না করলে পাহাড়ের সমস্যা সমাধান হবে না। 

একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, পাহাড়গুলোতে বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা কেএনএফ সবচেয়ে বেশি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। ২০০৮ সালে প্রতিবেশী ভূখণ্ডে প্রতিষ্ঠিত হলেও বাংলাদেশে কুকি-চিনের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে ২০২২ সালের এপ্রিলে। প্রথম দিকে রাঙামাটি ও বান্দরবানের ৯টি উপজেলার সমন্বয়ে ‘স্বায়ত্তশাসন ক্ষমতাসহ’ পৃথক রাজ্যের দাবি তোলে তারা। বান্দরবান তাদের প্রাণকেন্দ্র হলেও বর্তমানে ছড়িয়ে পড়েছে রাঙামাটি, খাগড়াছড়িতেও। এই সংগঠনের প্রধান নাথান বম বর্তমানে ভারতে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। সেখানে বসেই তিনি পাহাড়ি জনপদকে অশান্ত করার নীলনকশা তৈরি করেন।

তারা রাঙামাটি ও বান্দরবানের বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি, রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, লামা ও আলীকদম উপজেলায় সক্রিয়; যা আবার খাগড়াছড়ির লাগোয়। তবে ভারতের মণিপুর, মিজোরাম ও মিয়ানমারের চিন রাজ্য তাদের অন্যতম ঘাঁটি বলে গোয়েন্দারা দাবি করেন। 

জানা গেছে, তিন পার্বত্য জেলায় কমপক্ষে ১৫ সম্প্রদায়ের আদিবাসী বসবাস করে। এরা হচ্ছে- চাকমা, মারমা বা মগ, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, লুসাই বা মিজো, পাংখো, বম, মুরং বা ম্রো, খিয়াং, খুমি, চাক, বনজোগি, খিও, কুকি ও রাখাইন। এর মধ্যে চাকমা হচ্ছে বৃহত্তম নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী। আদিবাসীদের বেশিরভাগই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। বাকিরা হিন্দু, খ্রিস্টান প্রমুখ। 

কুকি-চিন বাদেও জনসংহতি সমিতি জেএসএস, ইউপিডিএফ ও ম্রো ন্যাশনাল পার্টির (এমএনপি) সদস্যরা বেশি সক্রিয়। এই চক্রের একাধিক সদস্য রয়েছে চাঁদাবাজের তালিকায়। তারা হচ্ছেনÑ নাথান বম, ফ্লেমিং, চেওসিম বম ও রোয়ান লিন বম, বিপ্লব চাকমা ও গরান্টু চাকমা, সমাজপ্রিয় চাকমা বা প্রসীত চাকমা, গোমেজ চাকমা, ইথু চাকমা, রবি চাকমা, সমির চাকমা বা তরেন চাকমা, অগ্রসর চাকমা, চোসেন্দ্র বা রিমিত চাকমা, গোয়েন্তা চাকমা, শ্রাবণ চাকমা, তারুম বা বিলাম চাকমা, সমন ত্রিপুরা, এগন্তন চাকমা, জলাইয়া, উজ্জ্বল, বিজয়, আদিরঞ্জন। এদের মধ্যে কে কার বা কোন গোষ্ঠীর লোক তা বোঝা মুশকিল। এ ছাড়া তারা খুব ঘন ঘন এলাকা ও নিজেদের নাম পরিবর্তন করে থাকেন।

প্রসঙ্গত, গত ২৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় জেলা সদরের সিঙ্গিনালা এলাকায় অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়। এ ঘটনার জেরে ২৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি ও গুইমারায় সহিংসতায় তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় খাগড়াছড়ি সদর ও গুইমারা উপজেলায় উদ্ভূত পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সর্বত্রই বিরাজ করছে থমথমে অবস্থা। 

জুম্ম ছাত্র-জনতার ডাকা অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ চতুর্থ দিনের মতো চলছে। যদিও সংগঠনটির পক্ষ থেকে গতকাল দুপুরে খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি-ঢাকা সড়কে অবরোধ শিথিলের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তার পরও আজও যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগও অচল হয়ে পড়েছে। ফলে মালবাহী শতাধিক ট্রাক আটকে আছে। তবে নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

শোকের শহর রামসু বাজার

খাগড়াছড়ি প্রতিবেদক জানান, খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলার রামসু বাজার এখন এক শোকের শহর। চারপাশে ধ্বংসস্তূপ, ঝলসে যাওয়া দোকানপাট ও ঘরবাড়ি, ছাইয়ের গন্ধে ভারী হয়ে আছে বাতাস। এক দিনের ব্যস্ত বাজার আজ নিস্তব্ধ- এ যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো এলাকা। এখানে মানুষের স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়েছে, প্রাণ হারিয়েছেন তিন তরুণ, অসংখ্য পরিবার হয়েছে নিঃস্ব।

রক্তাক্ত সেই দুপুর

গত রবিবার দুপুরে হঠাৎ করেই ছুটে আসে গুলির শব্দ। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, নিরাপত্তা বাহিনী প্রধান সড়ক থেকে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। মুহূর্তেই রক্তে লাল হয়ে যায় মাটি। পাখির মতো লুটিয়ে পড়েন থৈইচিং মারমা, আথুইপ্রু মারমা ও আখ্রাউ মারমা। মরদেহ পড়ে থাকে রাস্তায়, কিন্তু আতঙ্কে কেউ কাছে যাননি। যারা বেঁচে গিয়েছিলেন, তারা প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে পালিয়েছেন পাশের গ্রামে। অনেকে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছেন। অনেকে পালানোর সুযোগ না পেয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

সেদিন শুধু প্রাণহানি নয়, আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে মানুষের স্বপ্ন। রামসু বাজারে অন্তত ৫৫টি দোকান, ২৫টি বসতঘর ও ২০টি ভাড়াবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুরো বাজার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। একসময় যেখানে বেচাকেনা আর হাসিমুখের ভিড় ছিল, সেখানে এখন শুধু পোড়া টিন আর ছাইয়ের স্তূপ পড়ে আছে।

মায়ের কান্না, স্ত্রীর আহাজারি

নিহত থৈইচিং মারমার মা ডানুপ্রু মারমা ভেঙে পড়েছেন। কণ্ঠরোধে বললেন, আমার একমাত্র ছেলে কোনো দিন রাজনীতি করেনি। সে শুধু তেল কিনতে বের হয়েছিল। সেদিন যে তাকে এভাবে হারাতে হবে, কখনও ভাবিনি। আমার পুত্রবধূ এখন ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তার ভবিষ্যৎ কী হবে? আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও।

গুলিতে স্বামী হারানো কুতু মারমার চোখ ভিজে আছে অশ্রুতে। তিনি বলেন, আমার স্বামী গাড়ি চালাতেন। সেদিন দোকানে তেল নিতে গিয়ে আর ফেরেননি। আমার অনাগত সন্তান পৃথিবীতে বাবার মুখও দেখতে পাবে না। যখন সন্তান বাবার খোঁজ করবে, আমি কী বলব?

ধ্বংসের সাক্ষী একটি ছবি

ব্যবসায়ী ক্যজ হ্লা মারমা মোবাইল বের করে দেখান তার কিশোরী মেয়ের ছবি। অষ্টম শ্রেণির ছাত্রীটি দোকানে বসেছিল। সহিংসতায় তার দেহ রক্তাক্ত হয়ে পড়ে। কণ্ঠ কাঁপতে কাঁপতে তিনি বলেন, আমার চোখের সামনে মেয়েকে গুলি করেছে। আমার দোকানও লুট করে আগুন দিয়েছে। এত বছর তিলে তিলে যা গড়েছিলাম, সব শেষ। আমি এর বিচার চাই।

কার কাছে বিচার চাইব?

সহিংসতায় সব হারানো স্থানীয়রা ক্ষোভ উগড়ে দেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বলেন, আমাদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট সব পুড়িয়ে দেওয়া হলো। যাদের কাছে নিরাপত্তা চাইব, তারাই গুলি করে। উল্টো আমাদের সন্ত্রাসী আখ্যা দেয়। আমরা কার কাছে বিচার চাইব?

প্রশাসনের আশ্বাস, মানুষের হতাশা

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা, জেলা প্রশাসক এবিএম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার ও পুলিশ সুপার মো. আরেফিন জুয়েল। জেলা প্রশাসক জানান, পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে প্রশাসন থাকবে। পুলিশ সুপার বলেন, নিহতদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু আশ্বাস শুনে ভরসা পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবি, ন্যায়বিচার। নিহতদের পরিবার চায় হত্যাকারীদের ফাঁসি। কেউ কেউ বলছেন, শুধু তদন্ত কমিটি নয়, দোষীদের বিচারের আওতায় আনা ছাড়া শান্তি ফিরবে না।

থমথমে খাগড়াছড়ি

সহিংসতার পর থেকে খাগড়াছড়ি শহর, সদর উপজেলা ও গুইমারায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি আছে। চতুর্থ দিনের মতো জেলার অভ্যন্তরীণ সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। শুধু সীমিত আকারে মোটরসাইকেল ও ইজিবাইক চলছে। বাজারগুলো জনশূন্য, মানুষ ঘরবন্দি। তবে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহাসড়কে অবরোধ শিথিল করায় পরিবহন সেক্টরে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।

একটি ধর্ষণ থেকে শুরু

সবকিছুর সূচনা হয়েছিল একটি কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনায়। এর বিচারের দাবিতে ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’ চার দিন ধরে সড়ক অবরোধ কর্মসূচি চালাচ্ছিল। সেই অবরোধ চলাকালীন সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। রক্ত ঝরল, ঘরবাড়ি পুড়ল, দোকানপাট ছাই হয়ে গেল।

রামসুর ক্ষত

রামসু বাজারের মানুষ দিশাহারা। জীবিকা হারানো দোকানিরা জানেন না আগামীকাল কীভাবে পরিবার চালাবেন। সন্তান হারানো বাবা-মা জানেন না জীবনের অর্থ কী। স্ত্রী হারানো স্বামী কিংবা স্বামী হারানো স্ত্রী- সবার বুকেই একটিই প্রশ্ন- কেন?

রামসু বাজার এখন শুধু একটি নাম নয়, এটি এক গভীর ক্ষতের প্রতীক। যেখানে মানুষের ঘরবাড়ি, দোকানপাট ছাই হয়ে গেছে, আর শোকগাথায় ঢেকে গেছে পাহাড়ি জনপদের আকাশ। মানুষ আজও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়, কিন্তু উত্তর আসছে না।

খাগড়াছড়ি এখন শান্ত, দাবি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার

শারদীয় দুর্গাপূজা যেন ভালোভাবে পালন করতে না পারে, সেজন্য খাগড়াছড়ি অশান্ত করার চেষ্টা করেছে ফ্যাসিস্টরা- এমন মন্তব্য করে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, বর্তমানে পাহাড়ের অবস্থা শান্ত। সেখানে এখন কোনো সমস্যা নেই। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে খাগড়াছড়ি ইস্যু নিয়ে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, পূজা ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে করতে হয়। তারা যাতে ভালোভাবে এটা উদযাপন করতে না পারে, এটা ছিল কিছু লোকের উদ্দেশ্য। সেটিই তারা করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু সফল হয়নি। 

কিশোরীকে ধর্ষণের আলামত মেলেনি

খাগড়াছড়িতে যে মারমা কিশোরী সংঘবদ্ধ ‘ধর্ষণের’ শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে, তার স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদনে ‘ধর্ষণের কোনো আলামত পাননি’ বলে জানিয়েছেন পরীক্ষায় নেতৃত্ব দেওয়া চিকিৎসক।

ধর্ষণের আলামত পরীক্ষায় তিন চিকিৎসক দলের নেতৃত্ব দেওয়া খাগড়াছড়ি আধুনিক সদর হাসপাতালের চিকিৎসক জয়া চাকমা বলেছেন, আমরা মেডিকেল রিপোর্ট জমা দিয়েছি। সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। কিন্তু আসলে ধর্ষণের কোনো আলামত পাইনি। এই স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, আমাদের টিমে হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার মোশারফ হোসেন ও নাহিদা আকতার ছিলেন।

মারমা এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে বিক্ষোভ ও উত্তেজনা চলছে খাগড়াছড়িতে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর তাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে সদর থানায় মামলা করেন। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে পরদিন ভোরে সেনাবাহিনীর সহায়তায় একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

খাগড়াছড়িতে অবরোধ স্থগিত

চার দিন পর খাগড়াছড়ি থেকে অবরোধ পাঁচ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত করেছে জুম্ম ছাত্র-জনতা। গতকাল মঙ্গলবার রাত ৯টায় তাদের ফেসবুক পেজে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় জুম্ম ছাত্র-জনতা।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শারদীয় দুর্গোৎসবকে সম্মান জানিয়ে এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৮ দফা বাস্তবায়নের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে, চলমান অবরোধ কর্মসূচি ৫ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত করা হলো।

এতে আরও বলা হয়, গত ২৩ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে এক স্কুলপড়ুয়া জুম্ম কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের প্রতিবাদ ও অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমরা ধারাবাহিকভাবে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি গ্রহণ করি।

এরই মধ্যে সোমবার খাগড়াছড়ির ডিসির উদ্যোগে ডাকা আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত সভায় আমাদের ছয়জনের একটি প্রতিনিধিদল অংশগ্রহণ করে। প্রতিনিধিদল প্রশাসনের কাছে ৮ দফা দাবি পেশ করে, যা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পূরণের আশ্বাস দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রশাসন জানিয়েছে, অবরোধ প্রত্যাহার করা হলে ১৪৪ ধারাও তুলে নেওয়া হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা