অরণ্য ইমতিয়াজ, টাঙ্গাইল
প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:০৮ এএম
আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:১০ এএম
টাঙ্গাইল সদরের করটিয়া সুন্দরী খালের একপাশ দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে ভবন।সোমবার তোলা। প্রবা ফটো
টাঙ্গাইলে একসময়ের খরস্রোতা সুন্দরী খাল তার সৌন্দর্য হারিয়েছে আজ। খালটি দখল আর দূষণের শিকার। স্থানীয় প্রভাবশালীরা এর বিভিন্ন জায়গা দখল করে নিয়েছেন। এছাড়া হাটসংলগ্ন খালের জায়গায় স্থাপন করা হয়েছে শতাধিক অবৈধ স্থাপনা। এতে সুন্দরী খালের অস্তিত্ব বিপন্নের মুখে।
খালটি রক্ষা করা এবং পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ২০২২ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড খালের ৬.১৫০ কিলোমিটার খনন করে। এরপরও শতাধিক অবৈধ স্থাপনা রহস্যজনক কারণে রয়েই যায়।
স্থানীয়রা বলেন, টাঙ্গাইল সদরের করটিয়ার সুন্দরী খালটি একসময় স্থানীয় জমিদার ও পরিবারবর্গের নৌপথে যাতায়াতের একমাত্র পথ ছিল। সে সময় এ খাল দিয়ে পানসি নৌকাসহ বড় বড় জাহাজও চলাচল করত। সময়ের সঙ্গে খালটির স্রোতধারা হারিয়ে গেছে।
অবৈধ দখলদারদের কালো থাবায় এটি এখন মৃতপ্রায়। যেটুকু রয়েছে, তা-ও পরিণত হয়েছে ময়লার ভাগাড়ে।
প্রভাবশালীরা সুন্দরী খালটি দখল করে নিয়েছেন। খালের দুই তীরে গড়ে উঠেছে স্থাপনা। করটিয়া হাটের অংশে খালের পাশে স্থাপনা নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। কেউ কেউ পাকা ঘরও নির্মাণ করেছেন। অবশিষ্ট অংশে ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্য ফেলায় পরিবেশ মারাত্মক হুমকিতে রয়েছে।
স্থানীয়রা আর বলেন, টাঙ্গাইলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতার সমাগম ঘটে করটিয়া হাটে। সরকারি সা’দত কলেজসহ আশপাশের পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী-শিক্ষক প্রতিদিন ওই খালের পাশ দিয়ে চলাচল করেন। বর্জ্যর দুর্গন্ধ সহ্য করে তাদের যাতায়াত করতে হয়। নাকে রুমাল দিয়ে ছাড়া চলা যায় না।
জানা যায়, প্রভাবশালীদের কবল থেকে সুন্দরী খালকে উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১৬ সালে। জেলা প্রশাসন থেকে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে খালের কিছু অংশ দখলমুক্ত করা হলেও ফের সে জায়গা দখলে নামে ওই চক্রটি।
করটিয়া গ্রামের কয়েক ব্যক্তি বলেন, একসময় এই খাল দিয়ে বড় বড় নৌকা চলাচল করত। ব্যবসায়ীরা তাদের বিভিন্ন পণ্য আনা-নেওয়া করার জন্য এ খাল ব্যবহার করত। ধীরে ধীরে খালটি দখল হতে থাকে। পাশাপাশি চলে ময়লা ফেলার প্রতিযোগিতা। ময়লা-আবর্জনা পচে দুর্গন্ধ ছড়ায়।
সরকার ২০২২ সালে খাল খনন শুরু করে। তখন কিছু জায়গা দখলমুক্ত করা হলেও পরে বাকিগুলো আর দখলমুক্ত হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালীদের কারণে দখলমুক্ত করার কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
জানা যায়, খালের একটি অংশ বীরকুশিয়া, করটিয়া গ্রামের কয়েকজন মাটি ফেলে দখল করে নিয়েছেন। অপরদিকে হাটের অংশে খালের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে বহুতল ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। দুই ও তিন তলার দুটি ভবন খালের জায়গা দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে।
করটিয়া হাটের প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুল গফুর বলেন, আগে এ খাল দিয়ে নৌকা নিয়ে করটিয়া হাটে আসা-যাওয়া করতাম। খালে এখন আর পানি থাকে না। আশপাশের বাড়ির, হোটেলের ময়লা-আবর্জনা খালে ফেলা হয়। কিছু জায়গা দখলও হয়েছে। যাদের ক্ষমতা বেশি তারাই দখল করেছেন। এত বড় খালটি এখন কত ছোট হয়ে গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে করটিয়া বাজার কমিটির এক সদস্য অভিযোগ করে বলেন, বিগত দিনে সুন্দরী খালটি খনন করা হলেও কোনো অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়নি। যারা খাল খননের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন, তারা অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এ ব্যাপারে করটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরী খালকে উদ্ধারের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ময়লা ফেলার জন্য নির্ধারিত জায়গার ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে। এটি হয়ে গেলে খালে ময়লা ফেলা বন্ধ হবে।
টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রাখিল রায়হান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, কোনো খাল খনন করতে গেলে তখন তার আশপাশের জায়গা পরিমাপ করে পরিকল্পনা করা হয়। সুন্দরী খালের ব্যাপারে নোট রাখা হলো। পরবর্তী সময়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।