খুলনা নতুন জেলা কারাগার
মাশরুর মুর্শেদ, খুলনা
প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৫১ এএম
ছবি: সংগৃহীত
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বারবার সময়সীমা বাড়ানো, ব্যয় বৃদ্ধি ও নানা জটিলতার পর অবশেষে খুলনায় নতুন জেলা কারাগারের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরেও নতুন কারাগারটি পুরোপুরি হস্তান্তর হয়নি। কারণ প্রতিবার পরিদর্শনে নতুন নতুন ত্রুটি ধরা পড়ছে, যার কারণে প্রকল্পের মান ও টেকসইতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
২০১১ সালে একনেকে অনুমোদিত খুলনা জেলা কারাগার নির্মাণ প্রকল্পটি ২০১৬ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, দীর্ঘ ১৪ বছর লম্বা সময় ও আটবার সময়সীমা বাড়ানোর পর ২০২৪ সালের জুনে কাজের মেয়াদ শেষ হয়েছে। কিন্তু দুবার সময় সংশোধনে ১৪৪ কোটি টাকা বেড়ে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৮৮ কোটি টাকায়। ২০১৭ সালে প্রথম সংশোধনে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২৫১ কোটি টাকা। সময়সীমা বাড়িয়ে ২০১৯ সালের জুন। পরবর্তী তিন দফা সময় বৃদ্ধি এবং প্রতিবারই নানা অজুহাতে কাজ পিছিয়েছে। ২০২৩ শেষ সংশোধনে ব্যয় দাঁড়ায় ২৮৮ কোটি টাকা, সময়সীমা নির্ধারণ হয় ২০২৪ সালের ৩০ জুন। ফলে ৫ বছরের প্রকল্প শেষ হতে সময় লেগেছে প্রায় ১৪ বছর, ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।
একজন সিনিয়র প্রকল্প কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রশাসনিক জটিলতা, ঠিকাদারদের ধীরগতি ও পর্যাপ্ত তদারকির অভাব ছিল প্রধান বাধা। গত ২৫ মে হস্তান্তরের কথা থাকলেও অসম্পূর্ণ কাজের কারণে তা সম্ভব হয়নি। পলেস্তারা খসে পড়া, মরিচা পড়া দরজা-গ্রিল, লবণাক্ততার কারণে সীমানা প্রাচীরের ক্ষতি, অসম্পূর্ণ হাসপাতাল ও প্রশাসনিক ভবনের ফিটিংসসহ নানা ত্রুটি রয়েছে।
খুলনা জেলা কারাগারের জেল সুপার মো. নাসির উদ্দিন প্রধান বলেন, আমরা শুধু স্থাপনা, লাইট ও ফ্যানের গুণগত মান যাচাই করতে পারি, কাজের পূর্ণাঙ্গ মান যাচাই করার মতো অভিজ্ঞতা আমাদের নেই। মাটি ভরাট ও আগাছা পরিষ্কার দ্রুত শেষ করার জন্য বারবার অনুরোধ করেছি।
গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান জানান, অধিকাংশ ভবনের কাজ ৬-৭ বছর আগে শেষ হলেও দীর্ঘদিন ফেলে রাখায় লবণাক্ততার কারণে পলেস্তারা খসে গেছে, তবে এখন তা সংস্কার করা হচ্ছে। তবে কারা কর্তৃপক্ষের ক্ষোভের কারণে ত্রুটিমুক্ত সংস্কার এখনও সম্পূর্ণ হয়নি।
খুলনা জেলা কারাগারের জেল সুপার মো. নাসির উদ্দিন প্রধান ও জেলার মুহাম্মদ মুনীর হোসাইন কারাগার পরিদর্শনে সময় জেল সুপার নিজেও কাজের মান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বলেন, গত বছরের জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু চলতি সেপ্টেম্বরের মধ্যেও শেষ হবে বলে আশা ক্ষীণ।
খুলনার ভৈরব নদীর তীরে ১৯১২ সালে নির্মিত পুরনো জেলা কারাগারের ধারণক্ষমতা ৬৭৮ জন, কিন্তু বর্তমানে বন্দির সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ ১ হাজার ৪১২ জন। পুরনো কারাগারটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় নতুন কারাগারে স্থানান্তর প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। আইনজীবী অ্যাড. বাবুল হাওলাদার বলেন, স্থান সংকটের কারণে বন্দিদের মানবাধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে, নতুন কারাগার চালু না হলে সংকট মেটানো সম্ভব হবে না।
গণপূর্ত বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রাশিদুল ইসলাম জানান, নতুন কারাগারটি শুধু বন্দি রাখার জায়গা নয়, বরং একটি সংশোধনাগার হিসেবে পরিকল্পিত। এখানে রয়েছে পুরুষ, নারী, কিশোর-কিশোরীদের জন্য পৃথক ব্যারাক, ৫০ শয্যার হাসপাতাল, নারী বন্দিদের জন্য পৃথক হাসপাতাল, মোটিভেশন সেন্টার ও ডে-কেয়ার সেন্টার, শিশুসন্তানসহ নারী বন্দিদের জন্য বিশেষ ওয়ার্ড, বন্দিদের জন্য হস্তশিল্প ও বিনোদনকেন্দ্র, স্কুল, লাইব্রেরি, ডাইনিং হল, রান্নাঘর, সেলুন, লন্ড্রি, পুরুষ ও নারী কারারক্ষীদের জন্য কোয়ার্টারসহ মোট ৫৭টি স্থাপনা। এ ছাড়া বন্দিদের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক পুনর্বাসনের জন্য আলাদা মোটিভেশন সেন্টারও থাকবে।
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) এক স্থাপত্যবিদ বলেন, লবণাক্ত অঞ্চলে নির্মাণের জন্য বিশেষ মানসম্পন্ন উপকরণ ব্যবহার করা দরকার। যদি শুরুতেই পরিকল্পনা অনুযায়ী মানসম্পন্ন উপকরণ ব্যবহার করা হতো, তবে এত দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি হতো না। এখন সংস্কারের নামে আরও অর্থ ব্যয় হবে।
ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও আগামী অক্টোবরের মধ্যে নতুন কারাগারে বন্দি স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হবে। এ পর্যন্ত ১৭টি স্থাপনা বুঝে নিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে ২৮৮ কোটি টাকা ব্যয় ও দীর্ঘ দেরির পরও কি প্রকল্পের মান টেকসই হলো?