শামীম আনোয়ার, গৌরীপুর (ময়মনসিংহ)
প্রকাশ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৯:৫৩ পিএম
আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ২০:০৯ পিএম
ময়মনসিংহের গৌরীপুরে ভুটিয়ারকোনা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ গোলাম মোহাম্মদকে কলেজের ক্যাম্পাস থেকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কলেজের অধ্যক্ষকে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় ধেরুয়া কড়েহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক) আনোয়ার হোসেনসহ জড়িতদের গ্রেপ্তারে শুক্রবার (২৬ সেপ্টেম্বর) ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছেন এ কলেজের আন্দোলনকারী সাবেক শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী। লাঞ্ছিত অধ্যক্ষ গোলাম মোহাম্মদ এ ঘটনায় গৌরীপুর থানায় অভিযোগ করেন।
এ প্রসঙ্গে ধেরুয়া কড়েহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আনোয়ার হোসেনের মন্তব্য জানতে একাধিকবার তার মোবাইলে কল দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
গৌরীপুর থানার ওসি দিদারুল ইসলাম বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে মারধরের বিষয়ে গোলাম মোহাম্মদ অভিযোগ করেছেন। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপজেলা শিক্ষা অফিসার আঞ্জুমান আরা বেগম বলেন, স্কুল চলাকালীন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আনোয়ার হোসেন কীভাবে এখানে এলেন। সে বিষয়ে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আফিয়া আমীন পাপ্পা বলেন, ভিডিওটা আমি দেখেছি। মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে নিয়ে এ বিষয়ে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কলেজের অধ্যক্ষকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে কলেজের ক্যাম্পাস থেকে বৃহস্পতিবার দুপুরে বের করে দিচ্ছেন ধেরুয়া কড়েহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আনোয়ার হোসেন। এমন একটি ৮ সেকেন্ডের ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনার প্রতিবাদে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যায়। বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীও। এর প্রতিবাদে শুক্রবার ভুটিয়ারকোনা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজের সামনে মানববন্ধন ও ভুটিয়ারকোনা বাজারে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
প্রতিবাদ সমাবেশে গৌরীপুর পৌর বিএনপির সদস্য সচিব সুজিত কুমার দাস বলেন, এ ন্যক্কারজনক ঘটনায় আমরা লজ্জিত। শিক্ষকের মান ক্ষুণ্ন হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সামনে আমরা দাঁড়াতে পারছি না। আমার সন্তানদের প্রশ্নবাণে আমি জর্জরিত হয়ে এ প্রতিবাদ জানাতে এসেছি। প্রশাসনকে বলতে চাই, আনোয়ার হোসেন মাস্টারসহ জড়িতদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করুন। অন্যথায় এ প্রতিবাদের ভাষাও ভিন্ন হয়ে যাবে। আন্দোলনকারীরা আরও বলেন, আনোয়ার হোসেনের বিদ্যালয় এ ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে। তিনি ছুটি না নিয়ে নিজের স্কুলের পাঠদান বন্ধ রেখে, এখানে কীভাবে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করেছে, তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন পৌর বিএনপির সদস্য সচিব সুজিত কুমার দাস, অচিন্তপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জায়েদুর রহমান, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবুল কালাম, ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি আব্দুর রশিদ মেম্বার, যুবদল নেতা আলী জাহান, ছাত্রনেতা সেলিম আজাদ, অচিন্তপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি অলি, সাবেক ছাত্রনেতা আব্দুল মান্নান প্রমুখ।
অধ্যক্ষ গোলাম মোহাম্মদ জানান, গত বছরের ৫ আগস্টের আগে থেকে এক প্রতিপক্ষ শিক্ষার সুষ্ঠ পরিবেশ বিনষ্টের পাঁয়তারা চালিয়ে আসছিল। আমি সকালে কলেজে আসি। এরপর দুপুর ১২টার দিকে আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে ১৪/১৫ জন অর্তকিতভাবে কলেজ ক্যাম্পাসে ঢুকে আমাকে এলোপাতাড়িভাবে কিল-ঘুষি মারতে থাকে। একপর্যায়ে টেনেহেঁচড়ে জোরপূর্বক কলেজ থেকে বের করে দেয়। এ সময় তারা আমাকে হত্যারও হুমকিও দিয়েছে।
তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় জড়িত আনোয়ার হোসেন, রুমি মিয়া, অলি উল্লাহ, হুমায়ুন তালুকদার, সাইকুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম তালুকদারসহ অজ্ঞাত ৭/৮ জনের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সাজেদুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, একসঙ্গে স্যারের সঙ্গে ৩০ বছর শিক্ষকতা করছি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমাকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আমি দায়িত্ব নিতে চাইনি। কিন্তু এখানে দুটি পক্ষ হয়ে যাওয়ায় সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। স্যার তাদের ম্যানেজ করতে ব্যর্থ। স্যারের সঙ্গে একটি ঘৃণিত কাজ করা হয়েছে। যারা করেছে, তাদের বিচার হওয়া উচিত।
জানা গেছে, কলেজের নিয়োগবাণিজ্য, কমিটি গঠনসহ নানা অনিয়মের বিষয় নিয়ে অধ্যক্ষ গোলাম মোহাম্মদের অপসারণ দাবিতে গত বছরের জুলাই থেকে আন্দোলন শুরু করে কিছু শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের একাংশ।
৫ আগস্টের পর অধ্যক্ষ গোলাম মোহাম্মদকে পদ থেকে সরিয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে ধর্মের শিক্ষক সাজেদুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দুটি পক্ষ তৈরি হয়। সাজেদুল ইসলাম গত ১৭ সেপ্টেম্বর গোলাম মোহাম্মদকে আবারও অধ্যক্ষের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন। এরপর থেকে স্থানীয় একটি পক্ষ গোলাম মোহাম্মদকে কলেজে যেতে নিষেধ করে এবং তার কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেন।
মাওহা ইউনিয়ন জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক ওয়ালি উল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পরামর্শক্রমে বিষয়টি সমাধান করে স্যারকে কলেজে যাওয়ার জন্য বলা হয়েছিল। তিনি নিয়োগ বাণিজ্যসহ ১৩টি অভিযোগে অভিযুক্ত। তাই মানুষ তাকে সহজে মেনে নেবে না এটাই স্বাভাবিক। যখন স্যারকে ধাক্কা দিয়ে আনোয়ার হোসেন বের করছিলেন, তখন আমি বাধা দিয়েছিলাম। এর জন্য দায়ী স্যার নিজেই। এ ছাড়া ওয়ালি উল্লাহ অধ্যক্ষের তোলা চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।