ময়মনসিংহ অফিস
প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ২০:৪৯ পিএম
সেই ঘটনার শারীরিক ও মানসিক আঘাত এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি বৃদ্ধ হালিম উদ্দন।
সম্প্রতি ফেসবুকে জোর করে মাজার-ভক্ত এক ব্যক্তির চুল কাটার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তোলপাড় শুরু হয়েছে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, লম্বা জটবাধা চুল ও দাঁড়িসহ বাউল ফকিরের মতো দেখতে একজন বৃদ্ধকে ধরে তিনজন লোক জোর করে চুল কেটে দিচ্ছেন। ওই বৃদ্ধ নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা চালালেও শেষ পর্যন্ত তাদের সঙ্গে পেরে উঠেননি। যখন তার চুল কেটে দেওয়া হচ্ছিল তখন তিনি বলতে থাকেন, ‘আল্লাহ, তুই দেহিস।’
এদিকে প্রকাশ্যে জোর করে বিভিন্ন ব্যক্তির চুল কেটে দেওয়ার ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছেন ময়মনসিংহের সংস্কৃতিকর্মীরা। শুক্রবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকালে নগরের শিল্পাচার্য জয়নুল উদ্যান এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে সদ্য প্রয়াত কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী ফরিদা পারভীনের স্মরণ অনুষ্ঠানের শুরুতে আয়োজক সংগঠন ‘পরস্পর’-এর কর্মীরা প্রতীকী চুল কেটে এ প্রতিবাদ জানান। অনুষ্ঠানের একটি ব্যানারে লেখা ছিল, ‘আল্লাহ তুই দেহিস: মাজার ভাঙার সংস্কৃতিতে আঘাত, মানুষের ওপর অত্যাচারকারীদের ঘৃণা।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় ৪ মাস আগে হেনস্তার শিকার হওয়া ওই ব্যক্তির নাম হালিম উদ্দিন আকন্দ (৭০)। তিনি ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার কোদালিয়া গ্রামের বাসিন্দা। স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে হালিম ফকির হিসেবে চেনেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হালিম উদ্দিন উন্মাদ, পাগল বা মানসিক বিকারগ্রস্ত নন। সংসার জীবনে তিনি পুত্র ও কন্যা সন্তানের জনক। দীর্ঘদিন আগে থেকে তার মাথায় জট ছিল। তিনি হজরত শাহজালাল (রঃ) ও শাহ্ পরান (রঃ) এর একজন ভক্ত। আগে কৃষিকাজ করলেও এখন ফকিরি হালে চলাফেরা করেন। মাঝেমধ্যে কবিরাজিও করেন। গত কোরবানির ঈদের কয়েক দিন আগে উপজেলার কাশিগঞ্জ বাজারে হঠাৎ করেই একদল লোক এসে তার মাথার জট, দাঁড়ি ও চুল জোরপূর্বক কেটে দেন।
ঘটনার সময় বাধা দিতে গেলে শারীরিক নির্যাতন ও বল প্রয়োগ করার অভিযোগ তুলে বৃদ্ধ হালিম উদ্দিন বলেন, সেদিন (ঘটনার দিন) সকালে বাজারে একটি দোকানে বসেছিলাম। হঠাৎ কয়েকজন লোক এসে আমারে ছেছড়িয়ে বের করে আনে। আমি শক্তিতে তাদের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারিনি। ৮-১০ জন মিলে আমাকে শুয়ে ফেলে চুলে কেটে দিয়েছে। তখন আমি বেহুঁশ হয়েছিলাম।
সেই ঘটনার শারীরিক ও মানসিক আঘাত এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি বৃদ্ধ হালিম উদ্দিন। বাইরে বের হতে অস্বস্তি বোধ করেন। তিনি বলেন, সেই থেকে আমি কোন কামকাজ করতে পারি না, বাজারে যাইতে পারি না, রোগী ঝাড়তে পারি না। একরকম ঘরবন্দী আছি। হঠাৎ হঠাৎ অচেতন হয়ে যাই, মাথায় পানি ঢালতে হয়। যারা চুল কেটে দিলেন, তাদের বিচার চান কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমি কোনো কিছু কই না, যা করে মালিকে করব।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে হালিম উদ্দিনকে দেখতে গিয়েছিলেন ময়মনসিংহ বাউল সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম। তিনি বলেন, হালিম ভাই তরিকায়ে নক্সাবন্দিয়া ধারায় অনুরক্ত। বর্তমানে তিনি মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ। তার সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে আমরা ময়মনসিংহ বাউল সমিতির পক্ষ থেকে তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। সেইসঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের শাস্তি দাবি করছি।
মকবুল হোসেন নামের স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, সমাজে প্রত্যেকটা মানুষেরই স্বাধীনভাবে চলার অধিকার রয়েছে। কারো স্বাধীনতায় অন্য কারো হস্তক্ষেপ কোনভাবেই কাম্য নয়। আমি মনে করি হালিম উদ্দিনের সঙ্গে যা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ অন্যায়। এসব বিষয়ে সরকারকে কঠোর হওয়ায় প্রয়োজন।
এ বিষয়ে তারাকান্দা থানার ওসি মোহাম্মদ টিপু সুলতান বলেন, বৃদ্ধ ব্যক্তিটি এলাকায় হালিম ফকির হিসেবেই পরিচিত। তিনি কবিরাজিও করেন। গত ঈদুল আযহার আগে কয়েকজন কটি পড়া লোক এসে তার চুল কেটে গোসল করিয়ে নতুন কাপড় পরিয়ে দিয়ে চলে যায়। লোকগুলোকে স্থানীয় কেউ চিনতে পারেনি। আমরা বৃদ্ধের খোঁজ খবর নিয়েছি। সে কোনো আইনি পদক্ষেপ নিতে চাইলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তারাকান্দা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) জাকির হোসাইন বলেন, বৃদ্ধ ব্যক্তিটির সম্পর্কে থানার ওসিকে খোঁজ নিতে বলা হয়েছে। যদি ওরকম ঘটনা হয় তাহলে আমরা থানায় আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলব।