রাসেল মাহমুদ, বরগুনা
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৩৬ এএম
বরগুনা শহর ছাড়িয়ে উপকূলীয় জেলার গ্রামে গ্রামে এখন আতঙ্কের নাম ডেঙ্গু। বুধবার বগুড়া সদর হাসপাতাল থেকে তোলা। প্রবা ফটো
বরগুনা শহর ছাড়িয়ে গ্রামাঞ্চলেও ডেঙ্গুর প্রকোপ ছড়িয়ে পড়েছে। উপকূলীয় জেলার গ্রামে গ্রামে এখন আতঙ্কের নাম ডেঙ্গু। সরকারি হিসাব অনুসারে চলতি বছরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৩ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। বরিশাল ও ঢাকায় চিকিৎসার জন্য নেওয়ার পথে মারা গেছে আরও ৩৬ জন। সব মিলিয়ে ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধশত ছুঁই ছুঁই।
বরগুনায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আসল বাধা। দুই দিনে ছয় জনের মৃত্যু পাথরঘাটায় শোকের ছায়া নেমে এমেছে। সেই সঙ্গে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকার মানুষের মধ্যে ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্ক এতটাই যে, কেউ ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে তিনি বাঁচবেন কি না।
ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমলেও তারপরেও ৬ হাজারে ছাড়িয়েছে। এখনও প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ জন ভর্তি হচ্ছেন জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে। নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৪ জন।
বুধবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বরগুনা সিভিল সার্জন অফিসের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় শুধু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৪ জন। হাসপাতালে ভর্তি মোটা ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ১৪৪ জন।
জানা গেছে, এ বছর জেলায় এখন পর্যন্ত ৭ হাজার ১৩৭ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৬ হাজার ৯৯৩ জন। এ ছাড়া বরগুনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এখন পর্যন্ত ১১ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। জেলার বাইরে চিকিৎসা নিয়ে মারা গেছেন আরও ৪০ জন। এ নিয়ে জেলায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৫১ জন।
জেলা সদরের গৌরীচন্না ইউনিয়নের মনসাতলী গ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়নি এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। খোদ জেলা শহরের ড্রেনের বেহাল অবস্থার কারণে বছরজুড়েই পানি জমে থাকে। আর সেই পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করছে। এর ফলে জেলার মধ্যে সব থেকে বেশি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এ এলাকার মানুষ। ঘরে ঘরে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হওয়ায়, এলাকাটি ডেঙ্গু কলোনি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
তবুও নেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং মশক নিধন কার্যক্রম। স্থানীয়রা জানান, বরগুনা পৌর শহর ছাড়াও জেলার কোথাও নেই মশক নিধন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম। এতে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী ও মৃতের সংখ্যা।
বরগুনা গৌরিচন্না ইউনিয়নের মনসাতলী গ্রামের বাসিন্দা ছগির বলেন, পৌরসভায় ও ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্তরা ভোটের রাজনীতি করেন না। তাই জনগণের কষ্ট বুঝতে পারেন না। জনগণের নির্বাচিত মেয়র থাকলে ডেঙ্গু নিধন কার্যক্রম বেশি থাকত। গ্রামে ক্রমশ ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে।
বরগুনা সদরের ৭ ওয়ার্ডের বাসিন্দা টুলু বলেন, মশা প্রতিদিন বংশ বিস্তার করে। তাই মশা নিধনে করতে হলে প্রতিদিন কাজ করা উচিত। তা না হলে সামনে ডেঙ্গু আক্রান্তের রোগীর সংখ্যা বাড়বে।
বরগুনায় জুন মাসেই রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) জরিপ চালিয়েছিল। তখনই উঠে আসে ভয়ংকর তথ্য। বরগুনা পৌর এলাকায় ৩১ শতাংশ আর সদর উপজেলার গ্রামে ৭৬ শতাংশ বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ব্রুটো ইনডেক্স ২০ ছাড়ালেই ধরা হয় ঝুঁকিপূর্ণ। বরগুনার গ্রামে সূচক দাঁড়িয়েছে ১৬৩।
চিকিৎসকরা বলেন, জেলার ডেঙ্গু পরিস্থিতির উন্নতির জন্য সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে দায়ী করছেন সিভিল সার্জন।
বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. তাজকিয়া সিদ্দিকাহ বলেন, শহরের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন রোগীর বেশিরভাগ আসছে গ্রাম থেকে। পুরো জেলায় দিন দিন ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে।
বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ বলেন, কিছুদিন ধরে বরগুনায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কম রয়েছে। সোমবার রাতেই মারা গেছে ৪ জন। এ মাসের শুরুতে আবারও বাড়তে পারে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ডেঙ্গু আক্রান্তের প্রধান কারণ। মঙ্গলবার থেকে আজকের আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। এখন এ রকমই হবে। আজকে কম আছে আবার কাল বেড়েও যেতে পারে। সঠিকভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। আরও কিছুদিন না গেলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি বোঝা যাবে না।
বরগুনায় সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সেপ্টেম্বরে থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে লার্ভার ঘনত্ব বেড়েছে। এখন নিয়ন্ত্রণের একমাত্র উপায় সচেতনতা বাড়ানো আর ব্যক্তিগত উদ্যোগ। বরগুনায় ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ৭ হাজার ১৩৭ জন ছাড়িয়েছে, যা দেশের মোট আক্রান্তের এক-তৃতীয়াংশ। আর মারা গেছেন ৫১ জন।