ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার
প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ০৯:০৮ এএম
ছবি সংগৃহীত
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একসময়কার হাতির চারণভূমি হিসেবে খ্যাত মৌলভীবাজারের লাঠিটিলা সংরক্ষিত বনাঞ্চলে এখন টিকে আছে মাত্র তিনটি মা বন্যহাতি। এই বিপন্ন প্রাণীগুলোর অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। হাতিগুলোর জীবন ও বাসস্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবার উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ। গাজীপুর সাফারি পার্ক কিংবা দেশের অন্যকোনো স্থান থেকে হাতি স্থানান্তর করে লাঠিটিলায় পুনর্বাসনের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি বিশেষায়িত কারিগরি কমিটি। এই উদ্যোগ সফল হলে লাঠিটিলা পরিণত হতে পারে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতি সংরক্ষণ কেন্দ্রে। গত ৬ সেপ্টেম্বর সকালে থেকে ৮ সেপ্টেম্বর বিকাল পর্যন্ত ৩ দিনের পরিদর্শনে লাঠিটিলা বনাঞ্চলে হাতি পুনর্বাসনের উপযোগিতা, বনাঞ্চলের অবকাঠামো, খাদ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সম্ভাবনা যাচাই করা হয়।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, লাঠিটিলা সংরক্ষিত বনের আয়তন ৫ হাজার ৬৩১ একর। মৌলভীবাজার জেলা সদরের ৬০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে সিলেট বনবিভাগের জুড়ী ফরেস্ট রেঞ্জের পাথারিয়া হিল রিজার্ভ ফরেস্টের অংশ হলো লাঠিটিলা সংরক্ষিত বন। কমিটির পরিদর্শনকালীন স্থানীয় বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিত থেকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদানের নির্দেশনা দেওয়া হয়। তিন দিনের পরিদর্শন শেষে বিশেষায়িত কারিগরি কমিটি লাঠিটিলায় এক সভায় মিলিত হন।
সভায় উপস্থিত থেকে মতামত পেশ করেন দুবাই সাফারি পার্কের সাবেক প্রিন্সিপাল ওয়াইল্ডলাইফ স্পেশালিস্ট ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আলী রেজা খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মোখলেছুর রহমান, আরণ্যক ফাউন্ডেশন ঢাকার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ও হাতি বিশেষজ্ঞ মো. আব্দুল মোতালেব, বন্যপ্রাণী গবেষক মোহাম্মদ আশিকুর রহমান সমি, আইইউসিএন বাংলাদেশের সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার মোহাম্মদ সুলতান আহমেদ, বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল ঢাকার বন সংরক্ষক সানাউল্লাহ পাটুয়ারী, কেন্দ্রীয় অঞ্চলের বন সংরক্ষক জহির উদ্দিন আকন্দ, বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবুল কালাম, সিলেট বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ হুমায়ূন কবির, বন বিভাগের জুড়ী রেঞ্জ কর্মকর্তা নাজমুল হুসাইন, বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন (বিজিবি) লাঠিটিলা ক্যাম্পের হাবিলদার মো. ফারুক আহমেদসহ স্থানীয় জনসাধারণ।
স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘ চার যুগ আগে ভারতের আসাম রাজ্য থেকে আসা এক দল বন্যহাতি বিচরণ করতো পাথারিয়া হিলস রিজার্ভ ফরেস্টে। দুয়েক বছর আগেও পাথারিয়া বনে দল বেঁধে বিচরণ করত এই হাতিগুলো। মাঝে মধ্যে আসা-যাওয়া করত ভারতের আসাম রাজ্যের কিছু জায়গায়। বর্তমানে হাতির সংখ্যা ৩টি। এগুলো সংরক্ষণে উদ্যোগ গ্রহণ করায় লাঠিটিলা সংরক্ষিত বনে বন্যহাতির জন্য নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের নিরাপদ বসবাসও নিশ্চিত করা হবে।
সিলেট বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হুমায়ূন কবির বলেন, ‘দেশের মধ্যে লাঠিটিলা বন একটি সমৃদ্ধ বন হিসেবে পরিচিত। আমরা বনটি হাতির জন্য কতটা উপযোগী তা সঠিকভাবে জরিপ করে দেখব। যদি দেখা যায় হাতির জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যের ব্যবস্থা রয়েছে, তবে সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। তবে এক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের যেন কোনো ক্ষতি না হয়, সেটি সর্বাগ্রে বিবেচনায় রাখবে বন বিভাগ।’
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল ঢাকার বন সংরক্ষক সানাউল্লাহ পাটুয়ারী বলেন, সরকার চায়, এই এলাকায় হাতিকে কীভাবে সংরক্ষণ করা যায় তা নিশ্চিত করতে। কাগজপত্র অনুযায়ী হাতির মালিক সিলেটেই সবচেয়ে বেশি। হাতি বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করবেন, যেন মানুষের সঙ্গে হাতির কোনো সংঘাত না ঘটে এবং ফসল ও ঘরবাড়ির ক্ষতি এড়ানো যায়।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আলী রেজা খান বলেন, হাতির স্বাভাবিক বসবাসের জন্য নির্দিষ্ট নিরাপদ এলাকা জরুরি। হাতিকে বন্দি রাখা সম্ভব নয়, হাতি স্বাভাবিকভাবেই জানে কোন জায়গা তাদের জন্য নিরাপদ। সরকার চাইলে একটি নির্ধারিত বনভূমিকে হাতি সংরক্ষণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে সেখানে প্রজনন, চিকিৎসা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, হাতি অত্যন্ত স্মরণশক্তিসম্পন্ন প্রাণী। গন্ধ শুঁকে তারা তাদের বংশ বা গোষ্ঠী চিনতে পারে। বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কার হাতিরা একই বংশের।