সাইদুর রহমান আসাদ, সুনামগঞ্জ
প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৩৪ এএম
সুনামগঞ্জের বাণিজ্যিক এলাকা তাহিরপুরের দুটি নৌঘাট থেকে খাস কালেকশনের নামে এভাবেই আদায় করা হয় টাকা। প্রবা ফটো
সুনামগঞ্জের বাণিজ্যিক এলাকা তাহিরপুরের দুটি নৌঘাট থেকে খাস কালেকশনের নামে সাবেক উপজেলা ইউএনও আবুল হাসেমের বিরুদ্ধে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে রয়েছে। কাগজেপত্রে উপজেলা প্রশাসন প্রতি মাসে ওখান থেকে খাস কালেকশন আদায় দেখালেও, নদীপথে খাস কালেকশন আদায়ের নামে রীতিমতো চাঁদাবাজি করছেন বিএনপির স্থানীয় কিছু নেতাকর্মী। এর আগেও দু-বছর এই ঘাটে এভাবেই বাণিজ্য চলেছে। এতে তখনকার উপজেলা ইউএনওর সায় ছিল। তবে ওই সময়ের চাঁদবাজির টাকার ভাগ আওয়ামী লীগের সাবেক দুই এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতন ও অ্যাড. রনজিত চন্দ্র সরকার পেতেন বলে জানা গেছে।
কোন জলমহাল, বালুমহাল বা টোল আদায়ের ঘাট যখন ইজারা দেওয়া সম্ভব না হয়, নিয়ম অনুযায়ী উন্মুক্ত নিলাম বা সরাসরি দরপত্রের মাধ্যমে সাপ্তহিক বা মাসিক ভিত্তিতে ইজারাদার নিয়োগ করে খাস কালেকশন আদায়ের নিয়ম আছে। তাতে সরকারের রাজস্ব বাড়াতে সহায়তা করে। এক্ষেত্রে তহশিলদার নিজেও খাস কালেকশন আদায় করতে পারেন।
তাহিরপুরের বেলায় ব্যতিক্রম দেখা যায়। গত বৈশাখ মাসে এই উপজেলার ইউএনও শ্রীপুর বাজারঘাট ও ডাম্পের বাজারঘাট খাস কালেকশন দেওয়ার জন্য শুরু করেন তোড়জোর। স্থানীয় প্রভাবশালী বিএনপি নেতা জুনাব আলীর ওপর দায়িত্ব দেন এটির খাস কালেকশন কীভাবে দেওয়া যায়।
পরে দুই ঘাটই আনা হিসেবে ভাগ করা হয়, ষোল আনার ভাগ। অর্থাৎ দুটি ঘাটে ৩২ আনার ভাগ। শ্রীপুর বাজারের ঘাটের ক্ষেত্রে প্রতি আনায় সাত লাখ টাকা করে ১৬ ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়। একইভাবে ডাম্পের বাজারঘাট ১৬ ভাগে ভাগ করে চার লাখ টাকা করে আদায় করা হয়। শেষে এই টাকার বড় অংশ তুলে দেওয়া হয় ইউএনওকে।
এরপর খাস কালেকশন আদায়ের নামে জোরজুলুম করে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
এই ভাগবাঁটোয়ারা এবং টাকা আদায়ের অংশ সরকার পাচ্ছে নামমাত্র। প্রতি মাসে যা দেওয়া হচ্ছে, তা কোনো কোনো মাসে ১৪২৯ সনের ইজারা মূল্যের চার ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম।
জানা যায়, সর্বশেষ ১৪২৯ সনে শ্রীপুর বাজার নৌঘাট ইজারায় রাজস্ব আদায় হয়েছে ৮০ লাখ ৩৮ হাজার ৫০০ টাকা। চলতি বছরে বৈশাখ থেকে আষাঢ় মাসে খাস আদায় হয়েছে ৫ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। গড়ে প্রতি মাসে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা।
এভাবে এক বছরে আদায় হবে ২২ লাখ ২০ হাজার টাকা। এতেও সর্বশেষ ইজারা মূল্য থেকে সরকার ৫৮ লাখ ১৮ হাজার ৫০০ টাকা রাজস্ব আদায় কম পাবে।
ডাম্পের বাজার নৌঘাট সর্বশেষ ১৪২৯ সনে ইজারার মাধ্যমে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ১৮ লাখ টাকা। গত তিন মাসে এই ঘাটের নামে খাস আদায়ের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় হয়েছে দুই লাখ ৪৯ হাজার টাকা। গড়ে প্রতি মাসে জমা পড়েছে ৮৩ হাজার টাকা। এভাবে জমা হলে এক বছরে সরকার ৯ লাখ ৯৬ হাজার টাকা পাবে। এতেও সর্বশেষ ইজারা মূল্য থেকে সরকারের ৮ লাখ ৪ হাজার টাকা রাজস্ব আদায় কম হবে।
তাহিরপুর সীমান্তের তিন শুল্ক স্টেশন। ওখানকার তিনটি শুল্ক স্টেশন দিয়ে ভারতের মেঘালয় থেকে কয়লা-চুনাপাথর আমদানি হয়। আমদানি করা এসব পণ্য নদীপথে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হয়। কয়লা ও চুনাপাথর বোঝাই এসব নৌকা পাটলাই নদী দিয়ে রওয়ানা দিলেই শ্রীপুর বাজার নৌঘাট ও ডাম্পের বাজার ঘাটে চাঁদাবাজির শিকার হয়।
নৌ-শ্রমিকরা বলেন, নদীর বিভিন্ন এলাকায় পণ্যবাহী নৌকা আটকিয়ে চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা না দিলে হয়রানির শিকার হন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন তহশিলদার বললেন, এই বিষয়টি ‘ডিল’ করার জন্য আমাকে বলা হয়েছিল। আমি রাজি হইনি। শুনেছি একজন বিএনপি নেতা দায়িত্ব নিয়েছেন।
উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জুনাব আলী বললেন, আমি সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। কোথাও কোনো সমস্যা হলেই আমার নাম জুড়ে দেওয়া হয়। ডাম্পের বাজার ও শ্রীপুর বাজার ঘাটে খাস কালেকশন আদায়ে আমি জড়িত নই।
গণঅভ্যুত্থানের পরে সংসদ সদস্য না থাকায় মহাদাপটে বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করেন সদ্য বিদায়ি উপজেলা ইউএনও আবুল হাসেম। এ বিষয়ে তিনি বলেন, উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের ভূমি অফিসের তহশিলদার অশীষ কুমার চক্রবর্তী নদী থেকে খাস আদায় করছেন।
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়াও বললেন, কে টাকা তুলছে, কে তুলছে নাÑ এটি আপনাদের কাছ থেকে শুনলাম। খাস আদায় তহশিলদার করেন। তহশিলদার একা মানুষ, খাস আদায়ে অন্য কারও সহায়তা নিচ্ছে কি-না জানি না।