সুফল চাকমা, বান্দরবান
প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:১৩ পিএম
দুর্গম পাহাড়ি উপজেলা বান্দরবানের থানচিতে একমাত্র সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি পরিণত হয়েছে জীবন-মৃত্যুর মাঝপথে থেমে যাওয়া এক করুণ যাত্রাবিন্দুতে। চিকিৎসক, নার্স, ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের চরম সংকটে রোগীরা ভর্তি হওয়ার পরপরই রেফার করা হয় সদর হাসপাতালে, যেখানে পৌঁছানোর আগেই অনেকের নিভে যাচ্ছে প্রাণপ্রদীপ। আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা নারী থেকে শুরু করে কিডনি রোগীÑ মাঝপথেই থেমে যাচ্ছে অনেকের জীবন। স্বাস্থ্যসেবার এই চিত্র যেন পাহাড়ের অন্তরালে চলমান এক নীরব ট্র্যাজেডি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স যেন নিজেই রোগী।
২০২২ সালের ১৪ নভেম্বর এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। রেমাক্রী বাজার থেকে নদীপথে থানচি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনা হয় আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা শৈমেপ্রু মারমাকে। হাসপাতালে পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে রেফার করা হয় জেলা সদরে। কিন্তু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে দেওয়া হয়নি অ্যাম্বুলেন্স বা অক্সিজেন। ভাড়া গাড়িতে করে চিম্বুকের বারোমাইল এলাকায় পৌঁছানোর আগেই মৃত্যুবরণ করেন তিনি। সেই থেকে তার ৯ বছর বয়সি সন্তান শৈসাই মং মারমা বেড়ে উঠছে মায়ের স্নেহবঞ্চিত হয়ে।
একইভাবে চার সন্তানের জননী লেংরু ম্রো হারিয়েছেন তার স্বামী রেং য়ুং ম্রো-কে। কিডনি জটিলতায় ভুগে থানচি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর রেফার করা হয় বান্দরবানে। পথেই থেমে যায় তার জীবনের শেষ অধ্যায়।
থানচি উপজেলা সূত্রে জানা যায়, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ১৯৯৫ সালে ৩১ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও পরে এটি ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়। কিন্তু পরিকাঠামো বাড়লেও বাড়েনি জনবল কিংবা চিকিৎসা-সুবিধা। বর্তমানে ১২ জন চিকিৎসকের পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ২ জন। ১৮ জন নার্স থাকার কথা থাকলেও আছেন মাত্র ৪ জন। ৪ জন মিডওয়াইফ থাকার কথা থাকলেও একজনও নেই। ফলে ৫০ শয্যার হাসপাতালে কার্যত চিকিৎসা চলছে ৩১ শয্যার জনবল দিয়ে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছেন ৫ হাজার ১৯৮ জন রোগী। এর মধ্যে ৪৫৬ জনকে রেফার করা হয়েছে বান্দরবান সদর হাসপাতালে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ১৭ জন রোগী। আর রেফারের পথে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত সাতজন, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একমাত্র অ্যাম্বুলেন্সের চালক মংক্যসিং মারমা জানান, ২০১৯ সালে চাকরিতে যোগদানের পর অন্তত সাতজন রোগী, যাদের মধ্যে শিশু-নারীও ছিলেন, তার গাড়িতে রেফারের পথে মারা গেছেন।
দুর্গম থানচি উপজেলার প্রায় ৩০ হাজার মানুষ এই একটি মাত্র স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। অথচ চিকিৎসক, নার্স ও আধুনিক সুবিধার অভাবে এটি কার্যত অচল, বাস্তবে তারা বঞ্চিত মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার অধিকার থেকেও। স্থানীয়দের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে সরকার যদি জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসক, জনবল এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিশ্চিত না করে তবে আরও কত প্রাণ মাঝপথে ঝরে যাবে, তার হিসাব রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
থানচি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ওয়াহিদুজ্জামান মুরাদ বলেন, জনবল ও সরঞ্জাম সংকটের কারণে গুরুতর রোগীদের রেফার করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। কিন্তু দীর্ঘ পথের কারণে অনেকেই জীবিত অবস্থায় সদর হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন না।
বান্দরবান জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শাহীন হোসাইন চৌধুরী বলেন, শুধু বান্দরবান নয়, পুরো তিন পার্বত্য জেলাতেই চিকিৎসক সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। নতুন করে নিয়োগ হলে এ সমস্যার সমাধান হতে পারে।