শেরপুর প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৮:০৫ পিএম
টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে শেরপুরের ঝিনাইগাতীর মহারশি নদীর বাঁধ ভেঙে উপজেলা সদরের বাজারসহ আশপাশের নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকেছে। নদীতে বিলীন হয়েছে ১১ পরিবারের বসতবাড়ি। তবে ভারি বৃষ্টিপাত না হওয়ায় শুক্রবার (১৯ সেপ্টেম্বর) ভোর থেকেই কমতে শুরু করেছে নদ-নদীর পানি। আর ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ীতে বন্যার পানিতে নিখোঁজ দুইজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
ঝিনাইগাতীর বন্যাদুর্গত এলাকা বৃহস্পতিবার ঘুরে দেখা যায়, পানির তীব্র স্রোতে মহারশি নদীর বাঁধ ভেঙে খৈলকুড়া বাজার এলাকার অন্তত ১১টি ঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। বিদ্যুতের খুঁটিসহ বিভিন্ন স্থাপনাও ভেসে গেছে। সবজি ও ধানের খেত ডুবে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে মহারশি ও সোমেশ্বরী নদীর পানি বাড়তে শুরু করে। একপর্যায়ে মহারশি নদীর বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে ও উপজেলা সদর বাজারে পানি ঢুকে পড়ে। এ সময় পূর্ব খৈলকুড়া গ্রামের সাত্তার মিয়া, বারেক মিয়া, বাচ্চু মিয়া, রহিম মিয়া, আমিনুলের ঘরসহ সাত-আটটি বাড়ি ভেঙে চলে যায়। এছাড়া সোমেশ্বরী নদীর পানি বেড়ে ধানশাইল ইউনিয়নের কাড়াগাঁও-ধানশাইল সড়কের ওপর অন্তত হাটু পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এতে দুপুরিয়া গ্রামের ধানের আবাদের ব্যপক ক্ষতি হয়েছে।
পূর্ব খৈলকুড়া গ্রামের আব্দুস সাত্তারের ঘর ভেসে গেছে ঢলের পানিতে। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছরই পাহাড়ি ঢলে এমন কইরা বাড়িঘর ভাসায়া নিয়া যায়। কোনো রকমে খাটটা আর শোকেসটা বের করছি। আর কিছুই বের করতে পারি নাই। সরকারের লোকজন কী আর দিবে।’
গোমড়া গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা আব্দুল কাদের মিয়া বলেন, ‘আগাম সবজি ইন্ডিয়ান কেরালা জাতের শিম চাষ করেছি। প্রতিকেজি ২০০ টাকা দরে বিক্রি করে আসছি। শিমের খেত, কাকরোলের খেতে পানি উঠেছে। এখন গাছের গোড়া পঁচে গেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।’
আরেক কৃষি উদ্যোক্তা আনোয়ার হোসেন জানান, শীতের বিভিন্ন আগাম সবজি চাষ শুরু করেছিলাম। পানি এসে সব ডুবে গেল। আমরা ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি হতে মুক্তি চাই।
ভয়েস অব ঝিনাইগাতীর সভাপতি ও ইউপি সদস্য জাহিদুল হক মনির জানান, ডাকাবর এলাকার ঝালমুড়ি বিক্রেতা আব্দুল্লাহর ছেলে ইসমাইল হোসেন (১৭) বৃহস্পতিবার মহারশি নদীর তামাগাঁও এলাকায় নদীতে ভেসে আসা গাছ ধরতে গিয়ে স্রোতে নিখোঁজ হয়। পরে শুক্রবার সকালে তার মরদেহ ধানখেত থেকে উদ্ধার করা হয়।
নালিতাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহেল রানা বলেন, বুরুঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ঢলের পানিতে নিখোঁজ হয়। পরে বৃহস্পতিবার রাতে হুমায়ুন মিয়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ঝিনাইগাতী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ফরহাদ হোসেন জানান, পাহাড়ি ঢলের পানিতে ১১৩ হেক্টর রোপা আমন আবাদ পানির নিচে নিমজ্জিত হয়েছে। এর মধ্যে ৫০ হেক্টর সম্পূর্ণ ও ৬৩ হেক্টর আংশিক। তবে পানি দ্রুত নেমে গেলে আবাদের তেমন ক্ষতি হবে না।
ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আশরাফুল আলম রাসেল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত ত্রাণ ও রেসকিউ টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখিনুজ্জামান শুক্রবার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, নাকুগাঁও পয়েন্টে ভোগাই নদীর পানি বিপদসীমার ১৯৬ সেন্টিমিটার (সেমি) নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আর চেল্লাখালি নদীর পানি বাতকুচি পয়েন্টে ৬১ সেমি নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়াও মহারশি ও সোমেশ্বরী নদীর পানি কমছে। বৃষ্টি না হওয়ায় নদীগুলোর পানি আরও কমতে পারে।
মহারশিতে বিলীন ১১ পরিবারের বসতভিট
টানা কয়েকদিনের ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ঝিনাইগাতীর মহারশি নদীর বাঁধ ভেঙে বিলীন হয়েছে ১১ পরিবারের বসতভিটা। বসতভিটা হারিয়ে পরিবারগুলো আশ্রয় নিয়েছে স্থানীয় বুদ্ধিপ্রতিন্ধী এক বিদ্যালয়ে।
স্থানীয়রা জানান, বৃহস্পতিবার বেলা দেড়টার দিকে মহারশি নদীর ব্রীজ সংলগ্ন খৈলকুড়া এলাকায় নদীর বাঁধ ভেঙে অন্তত ১০টি গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। একই সঙ্গে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পাড় উপচে ঝিনাইগাতী উপজেলা সদর বাজারে পানি ঢোকে। এতে মুহূর্তে ভেসে যায় অন্তত ১১টি পরিবারের বসতভিটা। ভেঙে পড়ে বিদ্যুতের খুঁটি, ভেসে যায় ৫০টিরও বেশি মাছের ঘের। পানিতে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয় ৩৪৫ হেক্টর জমির আমন ধান ও ১০ হেক্টর সবজি খেত এবং আংশিকভাকে নিমজ্জিত হয় ৫৭৫ হেক্টর জমির আমন ধান ও ২৫ হেক্টর সবজি খেত। একদিনেই সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে অনেক পরিবার।
খৈলকুড়া এলাকার বিধবা রহিমা বেগম ভাঙা বাঁধের ধারে দাঁড়িয়ে আর্তনাদ করে বলেন, ‘আল্লাহ আমার সবকিছু নিয়ে গেছে, সব শেষ হয়ে গেছে, আমি এহন কই যামু? ফসল আবাদ নাই, ঘর নাই, মাছা বাইধি রাখার জায়গা নাই। বাপ-দাদার কষ্টের সব শেষ।’ গত দুই বছরে তিনবার ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার ঘরবাড়ি। এবারও মহারশি নদীর বাঁধ ভেঙে শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নিয়েছে পাহাড়ি ঢল। ভেসে গেছে তার দুটি ঘর, ফসলি জমি, সামান্য আসবাব।
বণিক সমিতির সভাপতি মো. মোখলেছুর রহমান খান বলেন, হঠাৎ নেমে আসা ঢলে ডুবে গেছে অনেক দোকানপাট, নষ্ট হয়েছে মালামাল। এমন পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে মহারশি নদীর পাশে একটি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ এবং বাজার এলাকায় টেকসই ড্রেন নির্মাণের জোর দাবি জানান তিনি।
এদিকে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, ২০২২ সালের ঢলে ব্রিজপাড়ের এই বাঁধ ভেঙে গেলেও সংস্কার হয়নি। তাই এ বছর আবারও একই জায়গায় ভাঙন দেখা দিল। বারবার বলার পরও উন্নয়ন বোর্ড ব্যবস্থা নেয়নি। শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখিনুজ্জামান বলেন, মহারশি নদীর স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্যে উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।