হাসনাত মোবারক
প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৪১ এএম
শাহজাদপুরের বড়াল নদীতে বুধবার নৌকাবাইচ চলার সময় লাফিয়ে ওঠে একটি শুশুক। ছবি: সংগৃহীত
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের বড়াল নদীতে গত বুধবার থেকে শুরু হয়েছে চার দিনব্যাপী নৌকাবাইচ। এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বিশাল আকারের বেশ কয়েকটি নৌকা। বুধবার বিকালে বড়াল নদী ভরে উঠেছিল বিনোদনপিপাসু দর্শকদের উপস্থিতিতে। নির্ধারিত সময়ে স্থানীয় নৌকা ‘পদ্মা এক্সপ্রেস’ বনাম পাবনা থেকে আগত নৌকা ‘শেরে বাংলা’র চলছিল তুমুল প্রতিযোগিতা। বাঘাবাড়ি নৌবন্দর থেকে পশ্চিম দিকে তীব্র বেগে ছুটে চলছিল নৌকা দুটি। ছলাৎ ছল শব্দ আর নদীর দুই পাড়ের দর্শকের কলধ্বনি একাকার হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ বাইচ দেখতে আসা দর্শকের দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেয় একটি জলজ প্রাণী। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া নৌকা দুটির সামনে লাফিয়ে পড়ে একটি শুশুক। প্রায় বিলুপ্ত এই প্রাণীটি তখন উপস্থিত লোকদের কাছে বিনোদনের খোরাক হয়ে ওঠে। সেই সঙ্গে অনেকেই স্মৃতিচারণা করতে থাকেন।
বিভিন্ন সমাজমাধ্যমে সরাসরি প্রচার হচ্ছিল নৌকাবাইচ। শুশুক বা ডলফিনের লাফিয়ে ওঠার মুহূর্তটির স্ক্রিনশট নিয়ে নিজস্ব ফেসবুক পেজে প্রচার করতে থাকেন অনেকে। রাসেল উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি তার নিজের ফেসবুক পোস্টে ডলফিনের ছবি পোস্ট করে লেখেন, ‘বাবার মুখ থেকে শুনছি ছোটবেলায়Ñ বাঘাবাড়ি নদীতে নাকি শুশুক থাকে। যাই হোক বিশ্বাস করে ভয় পাইতাম। বাঘাবাড়ি নদীতে অনেকদিন যাতায়াত করেছি। এখানে বসে দীর্ঘ সময় ছিপ বড়শি দিয়ে মাছ ধরেছি কিন্তু কখনও চোখে পড়ে নাই এ প্রাণীটি।’ তিনি আরও লেখেন, ‘প্রাণীটি পানি থেকে যে মাছের মতন লাফ দেয়, দৃশ্যটা একটা ভিডিওতে দেখতে পাই।’ আরও অনেকেই এই শুশুকটি নিয়ে মন্তব্য করেন।
বড়াল নদীর শুশুক সম্পর্কে কথা হয় বন্য প্রাণী গবেষক সীমান্ত দীপুর সঙ্গে। তিনি জানালেন, ‘বর্তমানে বিশ্বব্যাপী এই প্রাণীটি বিপন্নপ্রায়। সারা পৃথিবীতে শুশুক রয়েছে পাঁচ থেকে ছয় হাজারের মতো। তার মধ্যে বাংলাদেশে বসবাস করে অর্ধেক শুশুক।’ তিনি আরও বলেন, ‘বড়াল এলাকার ৭৮ ভাগ শুশুকের প্রাণ যায় কারেন্ট জালে আটকা পড়ে।’ তার কাছ থেকে জানা যায় আরও ভয়াবহ তথ্য। বড়াল এলাকার মানুষ মাছ ধরার ক্ষেত্রেও শুশুক মেরে ফেলে। শুশুক ধরে কেটে তার তেল পানিতে ছিটিয়ে দেয়, তখন সেই তেলের লোভে অন্যান্য মাছ এসে ভিড় জমায়। কী ভয়ঙ্কর লোভ মানুষের! তাই ক্রমেই ফুরিয়ে যাচ্ছে পদ্মা, যমুনা, বড়ালসহ অন্যান্য নদীর শুশুক।
মজার এই প্রাণীটিকে ইংরেজিতে বলে গ্যানজেস রিভার ডলফিন। এরা দলগতভাবে খাবার সংগ্রহ করে। দলের একে অপরকে বন্ধুর মতো সহযোগিতা করে। স্তন্যপায়ী এই প্রাণীটি সরাসরি বাচ্চা প্রসব করে ও বাচ্চা লালনপালন করে। দিন-রাতের প্রায় সারাক্ষণই তারা সজাগ থাকে। পুরো দিনের মধ্যে মাত্র ১৫-২০ মিনিট এরা ঘুমায়। এ সময়ও মস্তিষ্কের অর্ধেকটা অংশ বিশ্রাম নেয়। শরীরের অন্যান্য অংশ সচল থাকে। বুদ্ধিদীপ্ত এই প্রাণীটি রক্ষায় আমাদের সচেতন ও সচেষ্ট হওয়া দরকার।