শফিক সরকার, ময়মনসিংহ ও আলী আশরাফ, ফুলবাড়িয়া
প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:২০ এএম
ছবি: সংগৃহীত
একবার আখ রোপণ করলেই ফলন পাওয়া যায় তিন বছর। আর এই আখ দিয়ে তৈরি হয় লাল চিনি। আড়াইশ বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের এই লাল চিনি সম্প্রতি জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে। এতে বাড়ছে এর চাহিদা। তবে নানা সংকটে উৎপাদন বৃদ্ধি, মান নিয়ন্ত্রণ আর চাহিদা বাড়ানোই এখন মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলছি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় আখ থেকে হাতে বানানো লাল চিনির কথা।
ময়মনসিংহ শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে ফুলবাড়িয়া উপজেলা। ব্রিটিশ আমল থেকেই এই উপজেলার অধিকাংশ এলাকায় আখ চাষ হয়। বিশেষ করে পলাশতলি, বাগতা, এনায়েতপুর, চৌদার, ইচাইল, ভালুকজানসহ প্রায় ২০টি গ্রামে আখ চাষ হয়। দিন দিন এই আখ চাষে ঝুঁকছেন অন্যান্য গ্রামের চাষিরাও।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ফুলবাড়িয়া উপজেলায় আখ চাষ হয়েছে ৬৫০ হেক্টর জমিতে। যেখান থেকে লাল চিনি তৈরি হবে ১ লাখ ৩০ হাজার মণ। যার বাজারমূল্য প্রায় শতকোটি টাকা। আর এবার আখ রোপণ করা হয়েছে আরও ৭৫০ হেক্টর জমিতে। দিন দিন আবাদের জমি বাড়ছে।
এক কাঠা (সাড়ে ৬ শতাংশ) জমিতে আখ রোপণ থেকে শুরু করে হাতের প্রক্রিয়ায় লাল চিনি তৈরি করতে খরচ হয় ১৫ হাজার টাকা। যা বিক্রি করে আসে ২৫ হাজার টাকা। তবে কৃষকরা বলছেন, উন্নত জাত, ন্যায্য দাম ও প্রণোদনা পেলে এ চাষ আরও বাড়বে।
চাষিরা জানান, শুরুতেই ক্ষেত থেকে আখ কেটে পরিষ্কার করা হয়। এরপর মেশিন দিয়ে মাড়াই করে রস সংগ্রহ করে জাল দেওয়া হয়। প্রথমে রস আগুনে জাল দিয়ে ময়লা পরিষ্কার করা হয়। এরপর কয়েকটি লোহার কড়াইয়ে ঘণ্টাব্যাপী রস জাল দিতে হয়। একপর্যায়ে রস ঘন হয়ে আসতে থাকলে চুলা থেকে নামিয়ে কাঠের হাতল দিয়ে বিশেষ কৌশলে দীর্ঘ সময় নাড়াতে হয়। এভাবেই তৈরি করা হয় ঐতিহ্যবাহী লাল চিনি।
বাড়িতে অতিথি আপ্যায়নে কলা পিঠা, ফুকা পিঠা, ক্ষীরসহ নানা বাহারি পিঠা বানাতে এই চিনি ব্যবহার করা হয়। এই চিনি রাসায়নিক ব্যবহার ছাড়াই তৈরি করা হয়। এই চিনি থেকে ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, আয়রন এবং ম্যাগনেসিয়ামের মতো খনিজ উপাদান পাওয়া যায়।
লাল চিনির স্বাদও অতুলনীয়। বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ফুলবাড়িয়ায় ছুটে আসছেন এই চিনি কিনতে। তবে চাহিদার তুঙ্গে থাকা লাল চিনিকে রপ্তানিপণ্য হিসেবে এগিয়ে নিতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা।
চাষি কামরুজ্জামান বলেন, একসময় আখ চাষ কম হতো। চিনির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দিন দিন এর উৎপাদন বাড়ছে। এখন গ্রামের পর গ্রাম আখ চাষ হচ্ছে। তবে সরকারিভাবে কৃষকরা অনুদান পেলে এর আবাদ আরও বাড়বে। সেই সঙ্গে দেশে চিনির ঘাটতি কমবে।
ফুলবাড়িয়া হাটে কথা হয় এক চিনি বিক্রেতার সঙ্গে। তিনি বলেন, এই চিনি ফুলবাড়িয়ার সম্পদ। এটা জিআই পণ্য হওয়ায় আমরা ফুলবাড়িয়াবাসী গর্বিত। খেতে অনেক সুস্বাদু। প্রতি কেজি চিনি ১২০ টাকায় বিক্রি হয়।
ফুলবাড়িয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নূর মোহাম্মদ বলেন, লাল চিনি ফুলবাড়িয়াবাসীর এক গর্বের নাম। আখ চাষে লাভ পাওয়ায় উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন কৃষকরাও। তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, চাষিদের ঐক্যবদ্ধ করে সমিতি গঠনের মাধ্যমে লাল চিনির বিএসটিআই অনুমোদনের লক্ষ্যে কাজ চলছে।