× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ফেসবুকে ধর্ম নিয়ে কটূক্তি

ফের চার মাজারে হামলা

কুমিল্লা ও হোমনা প্রতিবেদক

প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:০০ এএম

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

ফের মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এবার কুমিল্লার হোমনায় চারটি মাজারে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেছে বিক্ষুব্ধ লোকজন। পরে তারা মাজারগুলোতে অগ্নিসংযোগ করে। হামলার সময় কোথাও কোথাও হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে মানুষকে জড়ো করা হয়। মাজারে হামলার বিষয়ে সরকারের কঠোর সতর্কবার্তার পরও হামলার ঘটনা ঠেকানো যাচ্ছে না। তুচ্ছ ঘটনায় প্রায়ই হামলা চালিয়ে লুটপাট করা হচ্ছে, জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে স্থাপনা। এ নিয়ে মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। মাজারে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে বিচার দাবি করেছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা। হামলার অজুহাত হিসেবে ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। বেশিরভাগ হামলায়ই হয়েছে ‘তৌহিদী জনতা’ ব্যানার করে। এর আগে ঢাকা, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, নোয়াখালী, সিলেট, সিরাজগঞ্জ ও শরীয়তপুরসহ আরও কয়েক জেলায় হামলার ঘটনা ঘটে।

কুমিল্লার হোমনায় ফেসবুকে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে মাইকে ঘোষণা দিয়ে চারটি মাজারে হামলা ও ভাঙচুরের পর আগুন দিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আসাদপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনা সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

জানা যায়, বুধবার সকাল ১০টা ৫২ মিনিটে ‘বেমজা মহসিন’ নামে একটি ফেসবুক আইডি থেকে এক যুবক ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দেন। এ ঘটনায় স্থানীয় লোকজন মহসিনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবিতে থানার সামনে বিক্ষোভ করেন। দুপুরে ওই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ইসলামী যুবসেনা হোমনা উপজেলা সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শরীফুল ইসলাম বাদী হয়ে ওই যুবকের বিরুদ্ধে মামলা করেন। বৃহস্পতিবার সকালে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়।

এদিকে ফেসবুকে আপত্তিকর ওই পোস্টকে কেন্দ্র বৃহস্পতিবার সকাল থেকে এলাকার বিক্ষুব্ধ লোকজন আসাদপুর গ্রামে কফিল উদ্দিন শাহ, হাওয়ালি শাহ, কালাই শাহ ও আবদু শাহ মাজারে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। পরে মাজারগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনার পর কুমিল্লা পুলিশ সুপার মো. নাজির আহমেদ খান ও হোমনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ক্ষেমালিকা চাকমা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

পুলিশ সুপার মো. নাজির আহমেদ খান বলেন ‘এ ঘটনায় উস্কানি ও ইন্ধনদাতাদের আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। দায়ীদের শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে।’

ইউএনও ক্ষেমালিকা চাকমা বলেন, গত বুধবার ধর্ম নিয়ে কটূক্তির কারণে জনতার মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তারই পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার বিক্ষুব্ধ জনতা মাজারে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দিয়েছে।

হোমনা থানার ওসি মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, ধর্ম নিয়ে কটূক্তিমূলক পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে জনতার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার এক যুবককে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়। তবুও বৃহস্পতিবার সকালে বিক্ষুব্ধ লোকজন মাজারে ভাঙচুর ও আগুন ধরিয়ে দেয়।

সরকারের কঠোর হুঁশিয়ারি

ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থান এবং সুফি মাজারে হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। গত ১৪ সেপ্টেম্বর প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রেস উইং থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। 

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সম্প্রতি সুফি মাজারে দুর্বৃত্তদের হামলার বিষয়টি সরকারের নজরে এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকার যেকোনো বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থান এবং সুফি মাজারে হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। হামলার সঙ্গে জড়িত অসাধু শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে কাজ করছে সরকার। ধর্মীয় উপাসনালয় ও সাংস্কৃতিক স্থান রক্ষায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মাজার-খানকায় হামলা

গত কয়েক দিনে দেশে অন্তত ১৬-১৭টি স্থানে বিভিন্ন মাজার ও খানকায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। ঢাকার ধামরাইয়ের বাটুলিয়া এলাকায় গত ১২ সেপ্টেম্বর বুচাই পাগলা (রহ.)-এর মাজারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এলাকাবাসীর দাবি, অন্য এলাকার লোকজন এই ঘটনা ঘটিয়েছেন। তারা আরও জানান, মাজারটিতে শরিয়াহবিরোধী কাজ হতো না। মাজারে মাদক নিষিদ্ধ ছিল। মাজারে দানের টাকায় একটি মসজিদ পরিচালনা করা হতো, দানের অর্থের একটি অংশ যেত মাদ্রাসায় এবং অসহায় মানুষদের সহায়তা করা হতো। ওইদিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পাঁচ শতাধিক মানুষ সানোড়া ইউনিয়নের বাটুলিয়া এলাকায় কালামপুর-সাটুরিয়া আঞ্চলিক সড়কের পাশে মাজারটি ভাঙচুরে অংশ নেয়।

গত ৬ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে মাজারে হামলা ও কবর থেকে মৃতদেহ তুলে আগুনে পোড়ানো হয়েছে। গোয়ালন্দে ‘তৌহিদী জনতা’ পরিচয়ে নুরুল হক ওরফে ‘নুরাল পাগলা’র কবর, বাড়ি ও দরবার শরিফে হামলার ঘটনা ঘটে। শুক্রবার দুপুরের পর হামলার এই ঘটনায় আহতদের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজনের মৃত্যু হয়। আহত অন্তত ২১ জনকে রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল ও ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, শুরুতে নুরাল পাগলার আস্তানায় দল বেঁধে প্রবেশের চেষ্টা করে একদল ব্যক্তি। এ সময় মাজারের ভক্ত ও বিক্ষুব্ধদের মধ্যে ইটপাটকেল ছোড়াছুড়ির ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে মাজারের দেওয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে সেখানে থাকা অনেককে মারধর ও স্থাপনা ভাঙচুর শুরু করে একদল ব্যক্তি। এর আগে পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকে।

গত ৯ সেপ্টেম্বের রাতে সিলেটের হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজারে হামলার ঘটনা ঘটে। হামলাকারীরা মাজারে থাকা ভক্তদের মারধর ও বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর করেছে। পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য, রবিবার থেকে শাহপরান মাজারে বার্ষিক ওরস চলছে। ওরসকে কেন্দ্র করে যাতে অসামাজিক কোনো কার্যক্রম না হয়, সেজন্য স্থানীয় ছাত্র-জনতা প্রতিদিনই নজরদারি করছিল। সেই ধারাবাহিকতায় রাতেও তারা মাজারে তাদের নজরদারি চালাচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে ওরসে আসা মাথায় লাল কাপড় বাঁধা একদল লোক বিনা উস্কানিতে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালায়।

গত ৯ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জ সদরের শ্যামপুর গ্রামে মাজারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। দুর্বৃত্তরা তিনটি কবর খুঁড়ে দেহাবশেষ নিয়ে যায়। প্রায় দিনভর গ্রামের ‘হযরত বড়পীর গাউসুল আজম দরবার শরীফে’ ভাঙচুর চালানো হয়। তিনটি কবর খুঁড়ে ভেতরে থাকা মানুষের হাড়, মাথার খুলি নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এছাড়া মাজারে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়।

মাজার কমিটির নেতারা বলেন, খাজা সফুরা পাগলী ২০ শতক জায়গায় ২০০৫ সালে হযরত বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানি (রা.) দরবার শরিফের নামে ওয়াকফ্ করে দিয়েছেন। এরপর থেকে এখানে দরবার শরিফের কার্যক্রম চলতে থাকে। সকালে মাজারবিরোধীরা মাইকে মাজার ভাঙচুরের ঘোষণা দেয়। এরপর তারা মিছিল নিয়ে এসে বিকাল পর্যন্ত তাণ্ডব চালায়। এ সময় মাজারের বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর করে তারা। তিনটি পাকা কবর ভেঙে কবরের ভেতরে থাকা দেহাবশেষ নিয়ে যায়।’

গত ১৩ সেপ্টেম্বর নোয়াখালী পৌরসভার লক্ষ্মীনারায়ণপুর এলাকার ফকির চাড়ু মিজি শাহ্ (র.) মাজার (দরগাহ বাড়ির মাজার) ভাঙচুর করে দুর্বৃত্তরা। জানা যায়, লক্ষ্মীনারায়ণপুর দরগাহ বাড়িতে প্রায় ২৫০ বছর আগে চাড়ু মিজি শাহ্ নামের এক সাধুকে দাফন করা হয়েছিল। পরে তার দাফনস্থান ঘিরে মাজার তৈরি করেন ভক্তরা। প্রতিবছর সেখানে মাসব্যাপী ওরস ও মেলার আয়োজন করা হতো। যদিও সেখানে বছরের বাকি সময়জুড়ে বড় পরিসরে কোনো কার্যক্রম চালানো হতো না। এদিনই গাজীপুরের পোড়াবাড়ি এলাকায় একটি মাজারে হামলা, ভাঙচুরের ও অগ্নিসংযোগে ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের কাছে শাহ সুফি ফসিহ পাগলার মাজার নামে পরিচিত এই মাজারটি। বেরা ৩টার দিকে গাজীপুর মহানগরের পোড়াবাড়ি এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে মাজারটিতে হামলা চালানো হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, ঘণ্টাব্যাপী মাজারে ভাঙচুর চালানো হয়। ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড ও মাদকের অভিযোগ তুলে আশপাশের বিভিন্ন এলাকার মাদ্রাসাছাত্র-শিক্ষক, মসজিদের ইমামসহ একদল গিয়ে সেই হামলা চালায়। মাজার কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের সেখানে মাদক নিষিদ্ধ। মাজারে আসা দানের টাকায় অসহায় মানুষদের সহায়তা করা হয়।

শরীয়তপুরের জাজিরায় ১৩ সেপ্টেম্বর আরশেদ পাগলার মাজারে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। বিলাশপুর ইউনিয়নের সফি কাজির মোড় এলাকায় অবস্থিত মাজারটিতে হামলা হয়। স্থানীয়রা জানান, জুমার নামাজ শেষে মাজারের সামনে অনেক মানুষ জড়ো হয়। তারা লাঠি নিয়ে মাজারটিতে হামলা চালায়। তারা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে মাজারের প্রশাসনিক ঘর, ভক্তদের থাকার ঘর, অতিথিদের থাকার পাকা ভবনে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। দুর্বৃত্তরা মাজারের ভেতরে অগ্নিসংযোগ করে। বেলা ৩টার দিকে পুলিশ ও সেনা সদস্যরা ঘটনাস্থলে গেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা