এম আর কামাল, নারায়ণগঞ্জ
প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৪:০৩ পিএম
প্রবা ফটো।
নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ আখড়া এলাকায় শতবর্ষ পুরনো একটি জরাজীর্ণ ভবনে চলছে ২৬ ও ২৭ নম্বর লক্ষ্মীনারায়ণ বালক-বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম। বহুবার ছাদ ধসেপড়া ও ফাটল দেখা দিলেও নিচতলায় ঝুঁকির মধ্যেই ক্লাস নিচ্ছেন শিক্ষকরা। শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের জীবন ঝুঁকির মুখে রেখে বছরের পর বছর ধরে চলছে এই অমানবিক পরিস্থিতি। বারবার নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানানো হলেও বছরের পর বছর ধরে আশ্বাস দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছে অভিভাবক ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে এ ব্যাপারে আবারও গতানুগতিক আশ্বাস দিয়েছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ও জেলা প্রশাসক।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ আখড়া এলাকায় দোতলা একটি ভবনেই ২৬ নম্বর ও ২৭ নম্বর লক্ষ্মীনারায়ণ বালক-বালিকা সরকারি দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয় অবস্থিত। ১৯৩৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে মাত্র সাতটি শ্রেণিকক্ষে দুই বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বর্তমানে বালক ও বালিকা শাখায় অধ্যয়ন করছে ৬৫০ শিক্ষার্থী। এ ছাড়া ২ জন প্রধান শিক্ষক, ১৪ জন শিক্ষক ও একজন দপ্তরি কর্মরত আছেন। ভবনটির ওপরের তলা ধসে পড়ার পর থেকে বিদ্যালয় দুটিতে প্রতিবছর শিক্ষার্থী কমছে বলে জানান শিক্ষকরা।
২০১৫ সালের ভূমিকম্পে ভবনটির ওপরতলার ক্লাসরুমগুলোর ছাদের বেশকিছু অংশ ধসে পড়লে ভবনটি অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত ও নড়বড়ে হয়ে যায়। সর্বশেষ ২০২৩ সালে সংকীর্ণ সিঁড়িটির মূল ধাপে ফাটল ও দ্বিতীয় তলার আরও দুটি কক্ষের ছাদ ভেঙে পড়লে ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে সদর উপজেলা প্রশাসন। বর্তমানে সারি সারি বাঁশ দিয়ে দ্বিতীয় তলার ছাদের ধস ঠেকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তখন থেকে ভবনের নিচতলায় দুটি কক্ষে প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি এবং পাশের লক্ষ্মীনারায়ণ জিউর আখড়া মন্দিরের অফিস কক্ষে চলছে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির পাঠদান কার্যক্রম। ভবনটির এই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার কারণে শিশু সন্তানদের স্কুলে দিয়েও ভয় এবং আতঙ্কে থাকেন তাদের অভিভাবকরা। এ ছাড়া মন্দিরে প্রতিনিয়ত পূজা-অর্চনা, ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ও ঢাক-ঢোলের উচ্চ শব্দের কারণে অফিস কক্ষে বিদ্যালয়ের অস্থায়ী শিক্ষা কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, একমাত্র ছেলে তৃষাণকে স্কুলের শ্রেণিকক্ষে পৌঁছে দিয়েও বাসায় ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতে পারেন না মা তৃষা ঘোষ। টানা ৩-৪ ঘণ্টা রাস্তাতেই দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। প্রতিনিয়ত ভয় ও আতঙ্ক তাড়া করে তাকে। তাই ছুটির আগ পর্যন্ত স্কুলের জানালার ফাঁকফোকর দিয়ে ছেলের প্রতি তীক্ষ্ণ নজর রাখেন এই নারী।
অভিভাবক তৃষা ঘোষ বলেন, ‘ধসেপড়া ছাদের নিচে বাঁশ দিয়ে ঠেস দেওয়া হয়েছে। আমরা প্রতিনিয়ত আতঙ্কে থাকি। ছেলেকে স্কুলে দিয়ে ছুটি না হওয়া পর্যন্ত বাইরে দাঁড়িয়ে থাকি। বাসায় ফিরি না।’
বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলেন, আমরা চাই একটি নিরাপদ ও সুন্দর শিক্ষার পরিবেশ। পুরনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি ভেঙে দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।
২৭ নম্বর লক্ষ্মীনারায়ণ বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুন নাহার বলেন, ‘গত ১০ বছরে প্রতিটি জেলা প্রশাসকের কাছে আমরা লিখিতভাবে আবেদন করেছি। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছেও আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। আমরা আর কত কাল অপেক্ষায় থাকব জানি না।’
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফেরদৌসী বেগম বলেন, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আবেদন আমরা শিক্ষা অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে পাঠয়েছি। এটি আগামী উন্নয়ন প্রকল্প ‘প্রকল্প-৫’-এর তালিকায় রয়েছে। আমরা আশা করছি দ্রুত ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হবে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, নতুন ভবনের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। আগামী প্রকল্পে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এটি বাস্তবায়ন করা হবে।