রোহিঙ্গা ক্যাম্প-১৩
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব, কক্সবাজার থেকে ফিরে
প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ০৮:৫৬ এএম
রোহিঙ্গা ক্যাম্প
কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার রোহিঙ্গা ক্যাম্প-১৩ ঘিরে গড়ে উঠেছে একাধিক অবৈধ বাজার। এসব বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট। কাঁঠালতলী বাজার এলাকায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তায় গড়ে ওঠা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ক্যাম্প ঘিরেই চলছে অবৈধ অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য। যেখানে বনভূমি দখল করে প্রভাব খাটিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে অসংখ্য দোকান; যা থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি শক্তিশালী চক্র। মাসে মাসে আদায় হচ্ছে মোটা অঙ্কের চাঁদা। ফলে সরকার হারাচ্ছে কোটি টাকার রাজস্ব।
সরেজমিনে দেখা যায়, রোহিঙ্গা ক্যাম্প-১৩তে মুদিদোকান, ফার্মেসি, কাঁচা বাজার, হোটেল, গ্যাসস্টোভ ও ট্রি-স্টলের দোকান, মাছ-মাংসের আড়ত, কাপড়, মোবাইল, জুয়েলার্সসহ বিভিন্ন রকমের দোকান বসানো হয়েছে। এসব দোকানের কোনোটিরই নেই বৈধ ট্রেড লাইসেন্স বা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন। এসব দোকানের প্রতিটি থেকে মাসে চাঁদা আদায় করা হয় তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা। এ অর্থের কোনো অংশই সরকারি কোষাগারে জমা হয় না। বরং তা চলে যাচ্ছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের পকেটে। এতে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব ও কর ফাঁকি যাচ্ছে স্থানীয় সরকার ও উপজেলা পরিষদের। পাশাপাশি ধ্বংস হচ্ছে বনভূমি, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। চাঁদা আদায় এবং দোকান দখল ঘিরে প্রতিনিয়ত অবনতি হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। অথচ অবৈধ দখল ও অর্থ বাণিজ্য থামাতে নেই মাঠ প্রশাসন কিংবা ক্যাম্প কর্তৃপক্ষের কোনো পদক্ষেপ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্থানীয় বন বিভাগ থেকে অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদের অনুরোধ জানিয়ে একাধিক চিঠি দেওয়া হলেও কার্যত কোনো অভিযানই পরিচালিত হয়নি। ফলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পটি এখন পরিণত হয়েছে এক অঘোষিত বাজারকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ঘাঁটিতে।
সরেজমিন ও তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, পালংখালীর নজু মিয়ার ছেলে আলমগীর একসময় ছিলেন সাধারণ যুবক। কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রছায়ায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন ক্যাম্প-১৩-এর এক অঘোষিত ‘জমিদার’। এই আলমগীর একাই বনের জায়গা দখল করে প্রায় ২৫০টি দোকান তৈরি করেছেন। প্রতিটি দোকান থেকে মাসিক ৫ হাজার টাকা ভাড়া আদায়ের মাধ্যমে আলমগীর একাই মাসে হাতিয়ে নিচ্ছেন ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বছরে প্রায় দেড় কোটি টাকা।
এখানেই শেষ নয়। বাজারটির নামও রাখা হয়েছে চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর নামে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি আড়ালে থাকলেও প্রতি মাসেই ভাড়ার ভাগ ঠিকই পৌঁছে যায় তার কাছে। এ ছাড়া নুরুল আলম ও শামশুল আলম মিলে দখলে রেখেছেন ৬০টির বেশি দোকান। সাবেক মেম্বার জয়নাল আবেদীন বলখেলার মাঠপাশে নিয়ন্ত্রণ করেন ১০০ দোকান। হামিদ মাস্টার ও বাবুল মিলে ভাড়া নিচ্ছেন ২৫০টিরও বেশি দোকানের। আরও আছেন মৌলবী ফজর হক, আলী মিয়া, শাহজাহান, সওয়ার মিয়া, সুলতান আহমদসহ অন্তত ১৫ জন প্রভাবশালী। যারা সবাই পালংখালী ইউনিয়নের স্থানীয় প্রভাবশালী এবং রাজনৈতিক পরিচয়ধারী। অভিযোগ রয়েছে, এরা প্রত্যেকেই ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার সমর্থিত বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তারা সরাসরি বাজার পরিচালনা করতেন। গত বছর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে পদচ্যুত হলে তারা আত্মগোপনে থেকে নতুন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আগের আয়-রোজগার অব্যাহত রেখেছেন।
জানা যায়, কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের উখিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান বনভূমি উদ্ধারে সহযোগিতা চেয়ে ২০২২ সালের ৭ জানুয়ারি, ক্যাম্প-১৩ ইনচার্জের কাছে একটি পত্র দেন (স্মারক নম্বর : ২২.০১.২২৯৪.৮০০.১৫.০০১২৫.৩০৫)। পত্রে বলা হয়Ñ বনের জমি অবৈধভাবে দখল করে দোকানপাট গড়ে তোলা হয়েছে। এগুলো দ্রুত উচ্ছেদ করতে হবে। কিন্তু তিন বছর কেটে গেলেও কোনো উচ্ছেদ হয়নি। উল্টো দোকানের সংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে সিন্ডিকেটের প্রভাব। সাধারণ রোহিঙ্গা ও স্থানীয়রা এসব সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ক্যাম্প ইনচার্জ আল ইমরান ফোনে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ক্যাম্পে এলে বিষয়টি নিয়ে সরাসরি আলোচনা করা যাবে, ফোনে নয়।’ তবে বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ক্যাম্প এলাকায় প্রবেশ করতে হলে তাদের আরআরসির সহযোগিতা দরকার। কিন্তু সহযোগিতা মিলছে না। ফলে উচ্ছেদ অভিযানও সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবৈধভাবে বাজার গড়ে ওঠায় বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উখিয়ার স্থানীয় এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, ‘আগে বন বিভাগের জমি লিজ নিয়ে চারা রোপণ ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতাম। এখন ইজারা ছাড়াই জায়গা দখল করে দোকান বসানো হয়েছে। এজন্য আমাদের ব্যবসাও শেষ।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন ট্রেড লাইসেন্স লাগে না। সরকারকে রাজস্ব দেয় না। এখন টাকা আয় করছে শুধু সিন্ডিকেট।’ তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘শুধু টাকা কামাই নয়, সিন্ডিকেট নিজেদের বাহিনী দিয়ে ভয়ভীতিও ছড়াচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ মুখ খুলতে সাহস পায় না।’
এ বিষয়ে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘বনভূমি দখল করে বাজার গড়ে তোলা অপরাধ। বন বিভাগ চাইলে এগুলো উচ্ছেদ করতে পারে।’
বন বিভাগের উখিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান বলেন, ‘১৩ নম্বর ক্যাম্পে অন্তত এক হাজার দোকান রয়েছে। আমরা উচ্ছেদের জন্য চিঠিও দিয়েছি। কিন্তু ক্যাম্প কর্তৃপক্ষ সহযোগিতা না করায় অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছে না।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্যাম্প ভিত্তিক বাজারগুলো শুধু অর্থনৈতিক নয়, নিরাপত্তাজনিত হুমকিও তৈরি করছে। কারণ অবৈধ অর্থ দিয়ে সন্ত্রাসী বাহিনী বেড়ে উঠছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতর স্থানীয়-রোহিঙ্গার মিশ্র বাণিজ্যে অপরাধমূলক লেনদেন বাড়ছে। বনভূমি ধ্বংস হয়ে পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, যদি দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান চালানো না হয়, তবে এই ক্যাম্প হয়ে উঠতে পারে অস্ত্র-ড্রাগ চোরাচালানের নতুন কেন্দ্র।