এনায়েতুর রহমান, পটুয়াখালী
প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:২৭ এএম
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী পুকুরে ডুবে যাওয়া ও পরবর্তী সময়ে তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হাসপাতালে ভাঙচুরের পর থেকেই বন্ধ রয়েছে আইসিইউ ইউনিট। প্রবা ফটো
পটুয়াখালী ২৫০ শয্যা হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) থেকে সেবা প্রদান ৫ মাস ধরে বন্ধ আছে। গত ১৪ এপ্রিল পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী পুকুরে ডুবে যাওয়া ও পরবর্তী সময়ে তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হাসপাতালের এই আইসিইউ ইউনিট (বিশেষায়িত বিভাগ) ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এরপর থেকে এই হাসপাতালের আইসিইউ বন্ধ আছে।
আইসিইউ সেবা বন্ধ থাকায় জেলার সংকটাপন্ন রোগীকে বরিশাল অথবা ঢাকায় গিয়ে সেবা নিতে হচ্ছে। এতে সংকটাপন্ন রোগীর জীবনের ঝুঁকি আরও বাড়ছে। অনেক সময় রোগী মৃত্যুর মুখেও ঢলে পড়ছেন। ফলে রোগীর স্বজনদের পাশাপাশি স্থানীয়দের মধ্যেও ক্ষোভ বাড়ছে।
পটুয়াখালী হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে গুরুতর অসুস্থ ও আহত রোগীদের নিবিড় চিকিৎসা ও ক্রমাগত পর্যবেক্ষণে রাখার জন্য হাসপাতালে ৫ বেডের এই আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করা হয়।
জেলার একমাত্র এই হাসপাতাল যেখানে মুমূর্ষু রোগীরা আইসিইউ সেবা পেত এবং ৫ বছরে পাঁচ শতাধিক রোগী এই আইসিইউ ইউনিট থেকে বিশেষায়িত সেবা নিয়েছেন।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ২০২৩-২৪ সেশনের হুসাইন মোহাম্মদ আশিক (২১) নামে এক শিক্ষার্থী ১৪ এপ্রিল বিকালে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন পুকুরে গোসল করতে গিয়ে পানিতে ডুবে যাচ্ছিলেন। এ সময় সঙ্গে থাকা বন্ধুরা আশিককে পানি থেকে তুলে প্রথমে দুমকি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য পটুয়াখালী হাসপাতালে নিয়ে আসেন। এখানে চিকিৎসারত অবস্থায় ওই শিক্ষার্থী মারা যান। তখন হাসপাতালে চিকিৎসকের অবহেলার অভিযোগ তোলা হয়। আশিকের মৃত্যুর খবরে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিট ভাঙচুর করেন।
চিকিৎসকের অবহেলার বিষয়ে অভিযোগ ওঠায় তৎকালীন জেলা প্রশাসক এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন খালেদুর রহমান মিয়াকে আহ্বায়ক করে ৮ সদস্যের এই কমিটিকে এক কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়।
অপরদিকে শিক্ষার্থীর মৃত্যু এবং আইসিইউ ইউনিট ভাঙচুরের পর থেকে এই হাসপাতালে আইসিইউ সেবা বন্ধ হয়ে যায়। মুমূর্ষু রোগীদের আইসিইউ সেবার জন্য বরিশাল অথবা ঢাকায় যেতে হয়। ইতোমধ্যে গত ১৪ আগস্ট এই হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিটের সেবা না থাকায় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বিথি সরকার নামে এক নারী। তিনি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় ১৩ আগস্ট বিকালে পটুয়াখালী হাসপাতালে ভর্তি হন। কিন্তু আইসিইউ বন্ধ থাকায় বরিশালে যেতে হয় তাকে। এর আগে ৩০ জুলাই জয়ত্রী দেবনাথ নামে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে এই হাসপাতালে আসে। কিন্তু আইসিইউ সেবা না পেয়ে ঝুঁকি নিয়ে বরিশাল নেওয়ার পথেই জয়ত্রী মারা যায়।
এভাবে এই হাসপাতালে আইসিইউ সেবা না পেয়ে রোগীর স্বজনরা ভয়ানক ক্ষুব্ধ।
জেলার একমাত্র আইসিইউ ইউনিট বন্ধ থাকার বিষয়টি জেলা সমন্বয় কমিটির সভায় তোলা হয়েছিল। সভায় শহরের বিশিষ্টজনরা বলেন, এটি সচল করা জরুরি।
ভাঙচুরে আইসিইউর ক্ষয়ক্ষতি প্রসঙ্গে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক দিলরুবা ইয়াসমিন লিজা বলেন, ভাঙচুরের ঘটনার পর একটি তদন্ত কমিটি গঠন হয়। তদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ মন্ত্রণালয়কে আমরা জানাতে পারিনি। তবে আইসিইউতে ব্যবহৃত বেশিরভাগ মূল্যবান যন্ত্রপাতি ভাঙচুর করা হয়েছে। তিনি বলেন, যাদের অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যায় বা যাদের জীবন সংকটাপন্ন তাদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও নার্সদের তত্ত্বাবধানে বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করে এই রোগীদের সেবা দেওয়া হয়। কিন্তু ভাঙচুরের কারণে বিশেষায়িত আইসিইউ সেবা বন্ধ আছে। তবে এই হাসপাতালটি ৫০০ শয্যায় উন্নীত হচ্ছে। ৫০০ শয্যায় উন্নীত হলে ফের মুমূর্ষু রোগী হাসপাতাল থেকে আইসিইউ সেবা পাবেন।
তদন্তে সুপারিশ ও ভাঙচুরের ক্ষয়ক্ষতি প্রসঙ্গে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, তৎকালীন জেলা প্রশাসক তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন। তার কাছেই আমরা প্রতিবেদন জমা দিয়ে দিয়েছি। পরে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করবেন কি না তা জেলা প্রশাসকের বিষয়।
এ প্রসঙ্গে পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক জুয়েল রানা বলেন, প্রতিবেদনটি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। হাসপাতালে পুনরায় আইসিইউ চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।