মাশরুর মুর্শেদ, খুলনা
প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:১৫ এএম
সরকার পরিবর্তন হলেও বদলায়নি খুলনার বাংলাদেশ কেবল শিল্প লিমিটেডের (বাকশিল) পুরনো চিত্র। প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক সিন্ডিকেট এখনও আগের মতোই নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার পালাবদলের পর এই সিন্ডিকেট নতুন রূপে হাজির হয়ে বর্তমান প্রশাসনের কাছের মানুষে পরিণত হয়েছে। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বদলে প্রতিষ্ঠানে জেঁকে বসেছে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর তদবিরের দৌরাত্ম্য। কর্মচারীদের ভাষায়, ‘নতুন এমডি এলেও পুরনো ছায়া এখনও ঘাড়ে চেপে আছে।’
প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কর্মচারীরা জানিয়েছেন, প্রভাবশালী একটি চক্র এখনও প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এদের নেতৃত্বে রয়েছেন কথিত ‘ছায়া এমডি’ এমএম মফিদুল ইসলাম, যিনি ব্যবস্থাপকের (প্রশাসন) অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করছেন। তাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় তার প্রভাব বাস্তব এমডির চেয়েও বেশি। তার সঙ্গে কাজ করেন অফিস সুপার (প্রশাসন) সরদার আহসান হাবিব রাজু, সহকারী ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. আজাদ হোসেন, ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) বেগ মুকিত হোসেন, নন-টেকনিক্যাল ম্যানেজার (প্রোডাকশন) তানভীর খান, সিকিউরিটি ম্যানেজার মামুন এবং ভিজিএ প্রোডাকশনের কর্মকর্তা খান অরিদ মোহাম্মদ শুভ। এদেরকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে প্রভাব বিস্তারের বলয়। এই সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য বেগ মুকিত হোসেন, যিনি খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এবং খানজাহান আলী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি, ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী খ্যাত বেগ লিয়াকত আলীর ছেলে।
কারখানার অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, মুকিত বাবার প্রভাব খাটিয়ে প্রথমে দৈনিক হাজিরাভিত্তিক (ডিএল) কর্মচারী হিসেবে চাকরিতে প্রবেশ করেন। পরে ২০১৩ সালে সরাসরি কর্মকর্তা (প্রশাসন) পদে নিয়োগ পান। অভিযোগ রয়েছে, ভাইভার আগেই অনেক প্রার্থীকে ফোনে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে প্রার্থী নির্ধারণ হয়ে গেছে। ফলে একক প্রার্থী হিসেবে চাকরি পান মুকিত। চাকরিতে যোগদানের পর পরই যেন আলাদিনের চেরাগ পেয়ে যান মুকিত হোসেন। পাঁচ বছর পর পদোন্নতির নিয়ম থাকলেও মাত্র ১৭ মাসেই পদোন্নতি পেয়ে হন সহকারী ব্যবস্থাপক।
দুদক অতীতে তার বিরুদ্ধে তদন্তে নামলেও প্রশাসনের অসহযোগিতা এবং রাজনৈতিক চাপে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। এমনকি গত বছর আওয়ামী সরকারের পতনের পরও ছিলেন বহাল তবিয়তে। গত মে মাসে দুই মাসের ছুটিতে আমেরিকা গেলেও এখনও দেশে ফেরেননি। ইতোমধ্যে দুই দফায় ছুটি বাড়িয়েছেন এবং তৃতীয় দফায় তদবির চলছে। কথিত আছে অফিসের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তাকে সরবরাহ করছেন সহকারী ব্যবস্থাপক মো. আজাদ হোসেন ও অফিস সুপার আহসান হাবিব।
অফিস সুপার (প্রশাসন) সরদার আহসান হাবিব ২০১৩ সালে চাকরিতে যোগদান করেন। অভিযোগ রয়েছে, তার শ্বশুর শেখ রেহানার বাড়ির কেয়ারটেকার হওয়ার সুবাদে গণভবনের তদবিরে পাওয়া চাকরিতে যোগদানের পর প্রথম কয়েক মাস এসেনশিয়াল ড্রাগস ও কেবল শিল্প এ দুই প্রতিষ্ঠান থেকেই একসঙ্গে সুযোগ-সুবিধা ও বেতন নেন। হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি নিজের ভোল পাল্টাতে রাস্তায় নেমে চকলেট বিতরণকালে স্থানীয়দের হাতে লাঞ্ছিতও হন।
অভিযোগ অস্বীকার করে আহসান হাবিব বলেন, ‘তার শ্বশুর শেখ রেহানার বাড়ির কেয়ারটেকার ছিলেন না, বরং তার পিতার ফুলতলার মাতমডাঙ্গায় একটি বিকাশের দোকান রয়েছে। আর ৬ বছর চাকরির পর আমার একটি মাত্র পদোন্নতি হয়েছে, বেতন বেড়েছে মাত্র ১০ টাকা।’
অপরদিকে এইচএসসি পাস মো. আজাদ হোসেন টাইপিস্ট হিসেবে নিয়োগ পেলেও একাধিকবার স্পেশাল প্রমোশনে হয়েছেন সহকারী ব্যবস্থাপক (প্রশাসন)। কর্মচারীদের মধ্যে তিনি সর্বোচ্চ ৩ বার স্পেশাল স্কেল বা প্রমোশন পেয়েছেন, যা বিরল। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন প্রশাসনে থাকার সুযোগে তিনি বহু নিয়োগ-সংক্রান্ত নথিপত্র গায়েব করেছেন। বিশেষত ২০১৩ সালে নিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
যদিও মো. আজাদ হোসেন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘নথি গায়েবের কথা প্রথম শুনলাম। দুদকের টিম এসেছিল, তাদের চাহিদা মতো তথ্য দেওয়া হয়েছে, তদন্ত চলছে।
একজন সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাংলাদেশ কেবল শিল্প লিমিটেড দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত কেবল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, যা টেলিযোগাযোগ ও বিদ্যুৎ খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও প্রশাসনিক অদক্ষতায় প্রতিষ্ঠানটি এখন উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, দক্ষ জনবল হারানো এবং আর্থিক লোকসানের মুখে পড়ছে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এখানে যোগ্যতা নয়, কার কার রাজনৈতিক তদবির আছে সেটাই বড় কথা। এতে মেধাবীরা বাদ পড়ে যাচ্ছে, উৎপাদনশীলতা কমছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ কেবল শিল্প লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. শহিদুল ইসলামের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।