চরফ্যাশন (ভোলা) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৬:৫০ পিএম
এক সময়ের ব্যস্ত নৌপথ, দেশি মাছের ভাণ্ডার এবং নদীকেন্দ্রিক জনজীবনের প্রাণ বেতুয়া খাল আজ যেন নিঃশ্বাস নিতে হিমশিম খাওয়া এক রোগীর মতো। ভোলার চরফ্যাশন ও লালমোহন উপজেলার মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া এই খাল এখন অবৈধ কারেন্ট জাল, সুতিজাল, বিহুন্দি, চায়না রিং জালসহ নানা ধরনের নিষিদ্ধ জালের কবলে বিপর্যস্ত।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, খালের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত জাল টানানো রয়েছে। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে পড়ায় মাছের চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। এতে করে ধ্বংস হচ্ছে খালের জীববৈচিত্র্য, বিপন্ন হচ্ছে স্থানীয় মানুষের জীবিকা।
স্থানীয় প্রবীণ জামাল উদ্দিন বলেন, ‘এক সময় এই খালে ট্রলার, স্টিমার চলত। বর্ষার মৌসুমে বোয়াল, গজার, শোল, পাবদাসহ দেশি মাছের সমারোহ থাকত। মাছ ধরা ছিল উৎসবের মতো। এখন সবই স্মৃতি।’
স্থানীয় মৎস্যজীবী নুরনবী বলেন, খালজুড়ে শুধু জাল আর জাল। ছোট পোনা থেকে শুরু করে ডিমওয়ালা মাছ পর্যন্ত ধরা পড়ছে। প্রজনন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশি মাছ হয়তো আর থাকবে না।
ক্ষোভ প্রকাশ করে সেলিম মাঝি বলেন, আমরা দেশি মাছ ধরতে পারি না। মাছ ডিম ছাড়ার আগেই মরে যাচ্ছে। আমাদের সন্তানেরা হয়তো শুধু বইয়ে দেশি মাছের কথা পড়বে।
অবৈধ জালের কারণে শুধু মাছ নয়, পরিবেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয় কহিনুর বেগম জানান, জাল বসিয়ে পানি আটকানোর কারণে কচুরিপানা জমে থেকে পচে যাচ্ছে। চারপাশে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, মশার উপদ্রব বেড়ে গেছে। বাচ্চারা বারবার অসুস্থ হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, চরফ্যাশনের বিভিন্ন বাজারে প্রকাশ্যেই নিষিদ্ধ জাল বিক্রি হচ্ছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে বছরের পর বছর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। এসব জাল কিনে এনে মাছ ধরছেন মৎস্যজীবীরা—আর ধ্বংস হচ্ছে খালের ভবিষ্যৎ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেতুয়া খাল রক্ষা করতে হলে নিয়মিত অভিযান, জনসচেতনতা এবং বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে দেশি মাছ হারিয়ে যাবে, যার প্রভাব পড়বে জাতীয় মৎস্যসম্পদেও।
চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে আমাদের নিয়মিত অভিযান চলছে। তবে শুধু প্রশাসনের প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়, জনগণের সহযোগিতা ছাড়া খাল বাঁচানো সম্ভব নয়।
চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসনা শারমিন মিথি বলেন, আমরা ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণ অবৈধ জাল জব্দ ও ধ্বংস করেছি। বেতুয়া খাল রক্ষায় আরও জোরালো অভিযান চলবে।