বান্দরবান প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:২৯ পিএম
বুধবার বান্দরবান মারমা বাজার পরিদর্শনে এসে জুম সবজি বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলছেন বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও বাজার ফান্ড প্রশাসক অধ্যাপক থানজামা লুসাই। প্রবা ফটো
বান্দরবান শহরের ঐতিহ্যবাহী মারমা বাজারে অবৈধ টোল আদায়কে কেন্দ্র করে নতুন করে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। একদিকে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও বাজার ফান্ড প্রশাসক অধ্যাপক থানজামা লুসাই সরাসরি ঘোষণা দিয়েছেন- এখানে টোল-ট্যাক্স আদায় বন্ধ হবে। অন্যদিকে, বাজার ইজারাদারের প্রতিনিধি রশিদ দিয়ে নিয়মিত টোল আদায় করে যাচ্ছেন। এমন হযবরল সিদ্ধান্তে জুমিয়া সবজি বিক্রেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
বুধবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকালে মারমা বাজার পরিদর্শনে এসে অধ্যাপক থানজামা লুসাই সরাসরি বিক্রেতাদের উদ্দেশে বলেন, এই পাহাড়ি হাটবাজারটি জুমিয়াদের শাকসবজি, ফলমূল বিনা টোলে বিক্রির জন্য নির্ধারিত। এটি কোনো বাজার ফান্ডের আওতায় নয়, তাই বাজার ইজারাদারের এখান থেকে টোল আদায়ের কোনো অধিকার নেই।’তিনি বিক্রেতাদের বলেন, ভবিষ্যতে কেউ টোল আদায় করতে চাইলে সঙ্গে সঙ্গে জেলা পরিষদকে জানাবেন। প্রয়োজন হলে আদায়কারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
এদিকে জেলা পরিষদের সূত্র বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মারমা বাজার থেকে টোল আদায়ের জন্য টেন্ডার পেয়েছেন মেসার্স মিল্টন ট্রেডার্সের মালিক মাও সেতুং তঞ্চঙ্গ্যা। তার নিযুক্ত প্রতিনিধি মো. আব্দুল মাবুদ দায়িত্ব দেন চসা মং মারমা ওরফে গুন্দু মারমাকে। কিন্তু জেলা পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে টোল আদায়ের অনুমোদন এখনো দেয়নি।
তারপরও চসা মং মারমা প্রকাশ্যে টোল আদায় করছেন নিয়মিত। চসা মং মারমা ওরফে গুন্দু টোল আদায় করার কথা এই প্রতিবেদককে স্বীকার করে বলেন, এক গাড়ি কলা ছড়ার জন্য ১,৫০০ টাকা, মারফা শসা প্রতি মণ ২০ টাকা, আদা ৩০ টাকা, শুকনা হলুদ ১২০ টাকা—এভাবেই কৃষিপণ্যের ওপর টোল বসানো হচ্ছে।
তারাছা থেকে আসা জুমিয়া কৃষক নারী সবজি বিক্রেতা থুইনু প্রু মারমা বলেন, প্রতি বাজারবারে ৫০ টাকা করে দিতে হয়। আজও দিয়েছি।একইভাবে বাঘমারা এলাকার সামাচিং মারমাও একই অভিযোগ করে বলেন, আমার মতো অল্প জুম চাষিকেও প্রতিবার ৪০ টাকা করে দিতে হয়। এটি খুবই অন্যায়।
গুংগুরু খিয়াং পাড়া থেকে আসা এক নারী বিক্রেতা জানান, আমি সামান্য শাক বিক্রি করি। সব বিক্রি করেও ১০০ টাকা পাই না, অথচ ২০-৩০ টাকা চাঁদা দিতে হয়।
এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর বান্দরবান পাড়াবাসীর পক্ষ থেকে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের কাছে অবৈধ টোল আদায় বন্ধের দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। ২৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি এতে সই করেন, যাদের মধ্যে আছেন আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য কে এস মং মারমা, আদিবাসী ফোরামের সভাপতি ডা. মংউষাথোয়াই মারমা, জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান থোয়াইং চ প্রু মাস্টারসহ অনেকে।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, পার্বত্য অঞ্চলে বাজার ব্যবস্থাপনার জন্য বাজার ফান্ড আইন রয়েছে। সেখানে প্রতিটি বাজারের সুনির্দিষ্ট এলাকা নির্ধারিত। মারমা বাজার সেই আইনে অন্তর্ভুক্ত নয়, বান্দরবান বাজার এলাকার মধ্যেও পড়ে না। তাছাড়া ১৯০০ সালের পার্বত্য শাসনবিধিতেও পাহাড়িদের কৃষিপণ্যে টোলের বিধান নেই। মারমা বাজার কোনো সরকারি স্বীকৃত বাজার নয়; এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পাহাড়ি নারীদের জীবিকার অন্যতম অবলম্বন। অথচ প্রায় দেড় দশক ধরে অবৈধভাবে টোল আদায় চলছে। জেলার আদিবাসী ফোরামের সভাপতি মংউষাথোয়াই মারমা বলেন, এটি ঐতিহ্যের বাজার, সরকারি বাজার নয়। অথচ ইজারার নামে একটি মহল অবৈধভাবে টোল আদায় করছে।
বাজার পরিদর্শন শেষে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক থানজামা লুসাই সাংবাদিকদের বলেন, দেখেছি এখানে বিক্রেতাদের ৯০ শতাংশই জুমিয়া নারী। তারা সবাই দূরদূরান্তর পাহাড় থেকে জুম ও বাগানের ফলমূল বিক্রি করতে আসছেন। দীর্ঘদিন ধরে তাদের জন্য বিশুদ্ধ পানি ও টয়লেটের ব্যবস্থা নেই। এটি খুবি দুঃখজনক। এই হাটবাজারে বিশেষ করে নারী জরুরি বিক্রেতাদের জন্য বিশুদ্ধ পানি ও টয়লেট ব্যবস্থাকরা অতিব জরুরি । তাই জেলা পরিষদ কিংবা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে দ্রুত এ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান স্পষ্ট জানিয়ে আরো বলেন , মারমা বাজারে অবৈধ টোল আদায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকবে। ভবিষ্যতে কেউ এর ব্যত্যয় ঘটালে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মারমা বাজার পরিদর্শনে চেয়ারম্যানের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য কে এস মং, জেলা পরিষদের নির্বাহী প্রকৌশলী পরাক্রম চাকমা, ডা. মং উষাথোয়াই, ক্য সা মং মারমা, উছো মং মারমা, চনুমং মারমা, নারী নেত্রী কৃপা ত্রিপুরা প্রমুখ।