মেহেদী হাসান শিয়াম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৩৬ এএম
পাটজাত মোড়কে চাল বিক্রির কথা থাকলেও এই বিধিনিষেধ মানছেন না চাঁপাইনবাবগঞ্জের চালকল মালিকরা। আইন অমান্য করে নিষিদ্ধ প্লাস্টিকের বস্তায় চাল বাজারজাত করছেন তারা। এতে পরিবেশ দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির শঙ্কা দিনদিন বেড়েই চলেছে।
স্থানীয়দের দাবি, পাট উন্নয়ন অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসন হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে নিয়ম মেনে পাটের বস্তায় চাল বাজারজাত করলে একদিকে যেমন পরিবেশে ভারসাম্য বজায় থাকবে, অন্যদিকে কৃষকরাও কাঙ্ক্ষিত মূল্য পেয়ে সোনালি আঁশ চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ হবেন।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় ২০১০ সালে ৭ অক্টোবর ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক আইন’ করে। এতে ধান ও চাল বিপণনে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। অথচ এ জেলার দুই শতাধিক চালকলে দৈনিক হাজার-হাজার মেট্রিক টন চাল নিষিদ্ধ প্লাস্টিকের বস্তায় মোড়কীকরণ করা হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, গোমস্তাপুর ও নাচোল উপজেলায় প্রায় দুই শতাধিক চালকল রয়েছে। এর মধ্যে ৮৬টি সয়ংক্রিয় চালকল (অটো রাইসমিল), প্রায় ২০টি বয়েল আর বাকিগুলো আতব চালের কল। এসব চালকলে দৈনিক প্রায় ১৭ হাজার মেট্রিকটন চাল উৎপাদন করে প্লাস্টিকের বস্তায় মোড়কীকরণ করা হয়।
সরেজমিন দেখা যায়, হাতে গোনা কয়েকটি চালকলে কিছু পাটের বস্তায় চাল বাজারজাত করা হলেও অধিকাংশ মিলগুলোতে চলছে প্লাস্টিকের বস্তার ব্যবহার। জেলা পাট উন্নয়ন অফিসের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৫ মাসে মাত্র ৯ বার প্লাস্টিক বস্তার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করে ১০টি মামলায় ৭৯ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, পাট উন্নয়ন কর্মকর্তা বড় বড় চালকল মালিকদের ছেড়ে ছোট চালকল মালিকদের প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করে। এতে রাঘব বোয়ালরা আইন থেকে ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে।
এদিকে চালকল মালিকরা সরাসরি এসব বিষয়ে কথা বলতে আগ্রহী না হলেও তাদের দাবি প্যাকেজিং খরচ কমাতে প্লাস্টিকের বস্তায় চাল বাজারজাত করা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক চালকল মালিক জানান, ৫০ কেজির একটি পাটের বস্তার দাম রমকভেদে ৫০ থেকে ৫৭ টাকা, সেখানে সর্বোচ্চ ২৫-৩০ টাকা দিলেই পাওয়া যায় একটি প্লাস্টিকের বস্তা। সে কারণে ব্যবসায়ীরা প্লাস্টিকের বস্তায় চাল বিক্রি করছেন।
জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আবু সাঈদ বলেন, প্লাস্টিক পরিবেশ এবং জীবজগতের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। প্লাস্টিক হাজার বছর ধরে পরিবেশে থেকে মাটি ও পানিকে দূষিত করে। এটি সামুদ্রিক প্রাণীদের জীবন কেড়ে নেয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. একেএম শাহাব উদ্দিন বলেন, প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা ও বিষাক্ত রাসায়নিক খাদ্য ও পানির মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে, যা হরমোনজনিত সমস্যা ও ক্যানস্যারের মতো গুরুতর রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। এটি মাইক্রোপ্লাস্টিক হিসেবে আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে পৌঁছাতে পারে।
জেলার অতিরিক্ত পাট উন্নয়ন কর্মকর্তা অজিত কুমার রায় বলেন, প্লাস্টিকের বস্তায় চাল বাজারজাত আইনের লঙ্ঘন। এসবের বিরুদ্ধে প্রতি মাসেই বিভিন্ন চালকলে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে আমরা যে স্বাধীন; তাও না। আমাদের কিছু প্রতিবদ্ধকতাও আছে। এর মধ্যেও আমরা চালকলে প্লাস্টিকের বস্তা বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে থাকি। আমাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে এসব ভিত্তিহীন।
তিনি বলেন, চালকল মালিকরা খরচের যে অজুহাত তুলছেন, এটা খুবই অযৌক্তিক। কারণ পাটের বস্তার সমপরিমাণ ৩৬০ গ্রামেরও বেশি চাল বাদ দিয়ে ৫০ কেজির বস্তা প্যাকিং করে বাজারজাত করা হয়। এতে চালকল মালিকদের তেমন আর্থিক ক্ষতি হয় না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আনিসুর রহমান বলেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় চালকলগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এর আগেও চালকল মালিকদের অনেক বোঝানো হয়েছে; এবারও তাই করা হবে। তারা আইন না মানলে আমরা অভিযান চালাব।